প্রতিটি প্রাণীর জন্য ঘুম অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু মানুষ বা অন্য যেকোনো প্রাণী যখন ঘুমায় তখন বাস্তবে কী হচ্ছে তা সম্পর্কে তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা থাকে না। যাদের অট্টালিকায় পরম নিশ্চিন্তে ঘুমানোর সৌভাগ্য আছে নিরাপত্তা নিয়ে তাদের খুব একটা দুশ্চিন্তা না থাকলেও খোলা আকাশের নিচে যাদের ঘুমিয়ে রাত কাটাতে হয় তাদের জন্য ঘুমই হতে পারে অনেক বড় বিপদের কারণ।

ঘুমন্ত অবস্থায় আক্রমণের শিকার, Source: techinfantry.fandom.com

প্রাণীদের জন্যেও ঘুম হতে পারে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিশেষ করে যেখানে শিকার আর শিকারী পাশাপাশি বসবাস করে। কারণ ঘুমের কারণে যেকোনো সময় তারা হতে পারে নিশাচর প্রাণীর শিকার। কিন্তু এতো ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রাণীকে ঘুমাতে হয়?

ঘুম নিয়ে অতীত ও বর্তমানে যত গবেষণা হয়েছে সবগুলোতে এ কথাই বার বার প্রমাণিত হয়েছে। এই ঘুম কেবল প্রয়োজনীয় নয়, অনেকের কাছে আলস্য কাটানোর ভালো উপায়ও। মানুষ যতদিন আয়ু পায় তার এক তৃতীয়াংশই খরচ করে ঘুমিয়ে। কিন্তু কেন ঘুম এত প্রয়োজনীয় তা অনেকেই জানেন না। ক্লান্তি দূর করা ছাড়াও ঘুমের আরও অনেক গুরুত্ব রয়েছে।

সম্প্রতি একটি গবেষণায় জানা গিয়েছে, পর্যাপ্ত পরিমাণে রাতভর ঘুম যেকোনো হৃদরোগ থেকে দূরে রাখতে পারে। বিজ্ঞানীরা আরো জানিয়েছেন যে, ঘুম বাড়াতে পারে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও। এছাড়াও বিভিন্ন মেটাবলিক রোগ যেমন ডায়াবেটিস ইত্যাদি থেকেও বাঁচাতে পারে ঘুম।

পর্যাপ্ত ঘুম শরীরকে সুস্থ রাখে, Source: NBC News

কিছু দিন আগে ঘুম নিয়ে নতুন করে গবেষণা চালান ইজরাইলের রামান গাট শহরের বার্লান ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা যাদের নেতৃত্ব দেন প্রফেসর লিওর অ্যাপেলবাম লেড, তাদের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে ঘুমের প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা। বিজ্ঞানীদের এই দলটি ঘুম সংক্রান্ত তাদের এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন ন্যাচার কমিউনিকেশন নামক জার্নালে। মানুষ যখন ঘুমায় তখন তাদের মস্তিষ্কের কোষগুলো পুনরায় পুষ্টি ও শক্তি অর্জন করে পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবার জন্য, অনেকটা পুনর্জীবন পাওয়ার মতো।

মস্তিষ্ক কোষের ক্ষয় পূরণ

এই গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা জেব্রাফিশ নামক মাছের উপর বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা চালান। মিঠা পানির এই মাছটির জিনগত বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশই মানুষের জিনগত বৈশিষ্ট্যের সাথে মিলে যায় বলে মানব সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণায় গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করা হয় এই মাছকে।

জেব্রাফিশ, Source: Second Life Marketplace

এই পরীক্ষার জন্য একটি বিশেষ ধরনের মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করা হয় যার নাম থ্রিডি টাইম ল্যাপ্স মাইক্রোস্কোপ। খুব ক্ষুদ্র কোনো প্রাণী বা অণুজীব বা কোষ সংক্রান্ত গবেষণার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। ঘুমের সময় মাছের মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে কী ধরনের পরিবর্তন হয় তা জানার জন্য একটি ঘুমন্ত জেব্রাফিশের সামনে এটি স্থাপন করে পর্যবেক্ষণ করা হয়, যার ভিডিও রেকর্ড হয় বিজ্ঞানীদের কম্পিউটারে। এছাড়াও বিজ্ঞানীরা হাই রেজুলেশন টেকনোলজি ব্যবহার করেন যার মাধ্যমে মস্তিষ্ক কোষের ডিএনএ এবং প্রোটিনের পরিবর্তন ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়।

ঘুমন্ত অবস্থায় (বামে) ও জাগ্রত অবস্থায় (ডানে) মস্তিষ্কের কার্যক্রম, Source:
WebMD

পরীক্ষাটিতে দেখা যায়, ঘুমের সময় শারীরিক অনেক ক্রিয়া সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও মস্তিষ্কের কোষের সকল ক্রিয়া কার্যকর থাকে ঘুমন্ত অবস্থাতেও। বয়সের সাথে সাথে মস্তিষ্ক কোষের কার্যকারিতা কমে যায় এবং মস্তিষ্কের অনেক কোষ ধ্বংস বা ক্ষয়প্রাপ্তও হতে পারে। তাছাড়া জাগ্রত অবস্থায় সিগন্যাল স্থানান্তর, স্মৃতি ধারণ ইত্যাদি কাজে মস্তিষ্কে যে চাপ পড়ে তথা যদি কোনো নিউরন (মস্তিষ্ক কোষ) ক্ষয় বা ধ্বংস হয় তবে সেই ক্ষয় পূরণের কাজটি হয় ঘুমন্ত অবস্থায়।

ক্রোমোজোমের কার্যকারিতা বৃদ্ধি

গবেষণায় বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন যে, জাগ্রত অবস্থার চেয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় ক্রোমোজোমের কার্যকারিতা বেশি থাকে। অর্থাৎ জাগ্রত অবস্থায় মস্তিষ্ক কোষের ক্রোমোজোমগুলো সঠিকভাবে ডিএনএ এর রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে না। যার ফলে ঘুমের ঘাটতি হলে মস্তিষ্কের উপর অনেক চাপ সৃষ্টি হয়।

ঘুমন্ত অবস্থায় মস্তিষ্কের কার্যক্রম কেমন হতে পারে তার মডেল, Source:
The Sleep Judge

এই ঘটনা ব্যাখ্যা করার জন্য প্রফেসর অ্যাপেলবাম গর্তময় রাস্তার কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে রাস্তাঘাটেও বিভিন্ন ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে। এখন যদি এই ক্ষয়পূরণ তথা রাস্তা মেরামত করার প্রয়োজন হয় তবে তা করতে হবে রাতে যখন মানুষ ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে এবং রাস্তাঘাটের ব্যবহার কম হয়। ঠিক সেরকমভাবেই জাগ্রত অবস্থায় মস্তিষ্ককে অন্যান্য অনেক কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে সে সময় নিউরনের ক্রোমোজোমগুলো পর্যাপ্ত ভাবে ডিএনএর যত্ন নিতে পারে না। তাই পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

তিনি আরও বলেন, ঘুম যেমন শারীরিক ক্লান্তি দূর করে তেমন নিউরনকেও স্থায়ীভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে। আর তাই জেব্রাফিশ, জেলিফিশ কিংবা মানুষ ও প্রাণিজগতের প্রতিটি প্রাণীর জন্য অন্যান্য স্বাভাবিক ও অপরিহার্য কাজের মতো ঘুমানো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। হয়তো এই ডিএনএর রক্ষণাবেক্ষণ সঠিকভাবে হওয়ার জন্য এবং মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখার জন্যই প্রাকৃতিকভাবেই ঘুমকে অপরিহার্য করা হয়ে হয়েছে প্রাণিজগতের জন্য।

ঘুম প্রাণীর জন্য অপরিহার্য। পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম শরীরকে যেমন সুস্থ রাখতে পারে ঠিক তেমনি অতিরিক্ত পরিমাণে ঘুম শরীরের জন্য ডেকে আনতে পারে ওজন বৃদ্ধি, হজম শক্তি কমে যাওয়া সহ অপরিমেয় ক্ষতি। তাই যতটুকু ঘুম প্রয়োজন নিয়মিত সকলের ততটুকুই ঘুমানো উচিত। চিকিৎসকদের মতে, প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ৭-৮ ঘন্টা ঘুমানোই যথেষ্ট। তবে তরুণ তথা ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৮-১০ ঘন্টা ঘুম প্রয়োজন।

Featured Image: Premier Physical Therapy In Omaha