প্যানিক এটাক হচ্ছে হঠাৎ করে অতিরিক্ত মাত্রায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়া বা অতিরিক্ত আতঙ্ক বোধ করা যার ফলে শরীরের স্বাভাবিকতাতেও তারতম্য দেখা যায়। আতঙ্কিত ব্যক্তি হতবিহ্বল হয়ে পড়েন, অসুস্থ বোধ করেন।

মানুষজনের সামনে বা ভীড়পূর্ণ স্থানে যখন প্যানিক এট্যাক বা আতঙ্ক তৈরি হয় তা অনেক সময় ভীতিকর হয়ে উঠে। এখানে তেমন ৫ টি উপায় সম্পর্কে বলা হলো যার মাধ্যমে এই ক্ষেত্রে নিজেকে সঠিকভাবে পরিচালনার একটি পথ পাওয়া যেতে পারে।

গত কয়টি বছর প্যানিক এট্যাক আমার জীবনে জড়িয়ে গিয়েছিলো আষ্টেপৃষ্ঠে। কখনো কখনো মাসে দুই বা তিনবার কখনো বা কোনো মাসে একবারও না। এবং তা হতো আমার বাড়িতেই। প্রথমদিকে বাড়িতে যখন এমনটি হত তখন প্রয়োজন অনুযায়ী আমি ল্যাভেন্ডার এসেনশাল অয়েল, ভারী কম্বল কিংবা প্রয়োজনীয় ঔষধ সেবন করতে পারতাম।

আর মিনিটের মধ্যেই আমার হৃদস্পন্দন ধীর হয়ে যেত এবং নিশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসতো। কিন্তু জনসমক্ষে যখন প্যানিক এট্যাক হয়? তখন পুরোপুরি ভিন্ন একটি চিত্র দেখা যায়। বিমানেও প্যানিকের অভিজ্ঞতা আছে আমার যেহেতু এটি মানুষজনের সাধারণ একটি জায়গা।

কিন্তু অপ্রত্যাশিত কিছু জায়গায় যেমন মুদি দোকানের অলিগলি আর ভীড় দেখে আমি বিহ্বল হয়ে যেতাম তখন খুব খারাপ একটা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হতো। দেখা গেছে ডলফিন দেখতে সমুদ্র-ভ্রমণে গিয়েও বিশাল আর উত্তেজিত ঢেউগুলো দেখেও আমি আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ছি।

আতঙ্কিত ব্যক্তি; Image source: sea.mashable

ম্যারিল্যান্ড সেন্টারের এনেকজাইটি এন্ড বিহেভিয়ারেল চেঞ্জ ডিপার্টমেন্টের একজন সাইকোলজিস্ট ড. ক্রিস্টিন বিয়ানচি এই সম্পর্কে কিছু তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘ঘরের বাইরে জনসমক্ষে যখন প্যানিক এটাক হয় এটি অধিক পীড়াদায়ক হয়ে থাকে। কারণ আক্রান্ত মানুষজন তাদের ঘরে সহজেই যে প্রক্রিয়াগুলোর মাধ্যমে স্থির হতে পারে, লোকজনের ভীড়ের মধ্যে তা করা হয়ে উঠে না।’

‘মোটকথা, ঘরের মধ্যে প্যানিক এটাক হলে সে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে যে আশেপাশে এমন কেউ নেই যে তার এই দুরাবস্থার দিকে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে যা আতঙ্কিত ব্যক্তির জন্য আরো অস্বস্তিকর।’

আতঙ্কিত ব্যক্তি এই নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন যে অন্য কেউ তাকে দেখছে, আবার পাগল ভাবছে কিনা! তাই এট্যাকের সময় এটা খেয়াল রাখা জরুরি আতঙ্কিত ব্যক্তিকে এমন লোকজনদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে যারা তার অবস্থার দিকে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে থাকবে এবং তাকে অস্থিরচিত্তের মনে করে পরিবেশ উত্তেজিত করে তুলবে।

বিয়ানচি নিচের ৫ টি উপায় সম্পর্কে বলেছেন –

১) আপনার ব্যাগ বা গাড়িতে ‘কাম ডাউন কিট’ রাখুন

সাথে রাখুন বক্সটি; Image source: primary paradise

আপনি যদি অবগত থাকেন যে বাড়ির বাইরে যেকোনো জায়গায় আপনার প্যানিক এট্যাক হতে পারে তাহলে ছোট একটি কিট (সরঞ্জাম) সর্বদা প্রস্তুত রাখুন।

ড. বিয়ানচির মতে জিনিসপত্রগুলো যেন এমন হয় যা আপনার শ্বাস-প্রশ্বাস ধীর করতে পারবে এবং আপনাকে স্থির করে তুলতে সাহায্য করবে।

  • মসৃণ কিছু স্টোন
  • এসেনশাল অয়েল
  • গুটিকা ব্রেসলেট বা নেকলেস যেগুলো সংস্পর্শে থাকবে
  • নাড়াচাড়া করার জন্য বোতলভর্তি বাবোল
  • ইনডেক্স কার্ডে লিখে রাখা কিছু দৃঢ় বিবৃতি
  • মিন্ট (ক্যান্ডি)
  • কালারিং বুক

২) নিজেকে নিরাপদ একটি জায়গায় নিয়ে চলুন

কর্মক্ষেত্রের নিরিবিলি জায়গাটি খুঁজে নিন; Image source: FamilyDoctor

যখন আপনার প্যানিক এট্যাক হবে মনে হতে পারে যে আপনার দেহ প্যারালাইজড হয়ে যাচ্ছে তাই যতদ্রুত সম্ভব ভীড় থেকে বের হয়ে আসুন কিংবা শান্ত এবং নিরাপদ একটি স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করুন। অর্থাৎ প্যানিক এট্যাকের সম্ভাবনা দেখলেই নিজে স্থান পরিবর্তন করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন। হইচই, কোলাহলমুক্ত একটি স্থানে যেটিকে পাবলিক প্লেস বলা যায় না তেমন জায়গাটিতেই নিজের অবস্থান নিশ্চিত করুন কিছুক্ষণ।

বিয়ানচি বলেন, ‘এটা হতে পারে খোলামেলা একটা জায়গা যেখানে নিশ্বাসের জন্য সতেজ বাতাস পাবেন, কর্মক্ষেত্রে হতে পারে খালি একটি অফিস রুম যেখানে বসে আপনি কাজ করেন। পাবলিক পরিবহনের যে সারিটা তুলনামূলক শূন্য সেদিকে চলে যান। আর যদি এমনই হয় আপনি ভীড় থেকে বের হওয়ার কোনো সুযোগ পাচ্ছেন না, পাচ্ছেন না শান্ত কোনো জায়গায় স্থানান্তরিত হতে তখন কানে একটি হেডফোন গুঁজে দিন। এতে অন্তত কোলাহল থেকে রক্ষা পাবেন।’

তাছাড়া আপনি যখন নতুন একটি জায়গায় চলে আসবেন অথবা একটি হেডফোন পাবেন কোলাহল থেকে রক্ষা পাবেন তখন খুব ধীরে ধীরে গভীর কিছু নিশ্বাস নিন এবং প্যানিক এট্যাক এড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও ব্যবহার করতে পারেন।

৩) প্রয়োজন হলে কাউকে সাহায্য করতে বলুন

সাপোর্টিভ বন্ধুর কাছে থাকুন; Image source: ebony.com

আপনার প্যানিক এট্যাক মাঝেমধ্যে এমন প্রকট হতেই পারে যে আপনি নিজে নিজেই তা সামলানোর উপযুক্ত না ও হতে পারেন। তাই যদি একা থাকেন, আশেপাশে কাউকে তৎক্ষনাৎ পেলে একটু সাহায্যের জন্য আবদার করুন।

৪) নিজেকে সান্ত্বনা দিন যে বাড়িতেই আছেন

যখন আপনি মানুষজনের সংস্পর্শে থাকবেন যে কাজগুলো করলে প্যানিক এট্যাক প্রতিরোধে আপনার সাহায্য হবে সেগুলো করুন। বিয়ানচি তেমনই কিছু পদ্ধতির কথা বলেছেন –

ধীরে ধীরে নিশ্বাস নিন (মোবাইলে অনেক ধরণের এপ পাবেন যেগুলো আপনাকে সাহায্য করবে), এমনভাবে যেন আপনার ডায়াফ্রাম অর্থাৎ মধ্যচ্ছদা আপনার আরো কাছে উঠে আসছে। এটিই বারবার করতে থাকুন।

৫) যেখানে আছেন সেখানেই থাকুন

সবশেষে বিয়ানচি পরামর্শ দেন যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে আপনার প্যানিক এট্যাক হয় সোজাসুজি বাড়িতে চলে না গিয়ে সেখানেই থাকুন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করুন যেগুলো আপনার প্যানিক এট্যাক প্রতিরোধ করতে সক্ষম।

নিরিবিলিভাবে হাঁটাচলা করুন; Image source: steemit

তা হতে পারে:

  • সামান্য উষ্ণ কিংবা শীতল কোনো পানীয় পান করুন।
  • স্ন্যাক খেতে পারেন তাতে ব্লাড সুগার পরিপূর্ণ হবে
  • ব্যস্ততাহীনভাবে হাঁটাচলা করুন
  • মেডিটেশন করুন
  • অন্তরঙ্গ বন্ধু বা সহায়ক কারো কাছে গিয়ে ঘুরে আসুন
  • পড়ুন বা আঁকাআঁকি করুন।

এই কৌশলগুলো জনসমক্ষে আপনার প্যানিক এট্যাককে দূরীভূত করতে সাহায্য করবে।
জনসমক্ষে প্যানিক এট্যাক বেশি ভয়াবহ হয়ে উঠে যখন আপনি অপ্রস্তুত এবং একা থাকেন। এই সময়ে কিভাবে নিজেকে পরিচালিত করতে হবে তা জানা থাকলে প্যানিক এট্যাকের তীব্রতা থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব।

Feature Image: Care2.com