পরিচিতি

সবুজ রঙের গুল্ম জাতীয় সুগন্ধযুক্ত ঔষধী একটি উদ্ভিদ তুলসী। তুলসী বলতে বুঝায় যার তুলনা নেই। ইংরেজিতে এটির নাম Holy Basil, Sacred Basil. বৈজ্ঞানিক নাম: Ocimum Sanctum। ইউনানী নাম: রায়হান। আয়ুর্বেদিক নাম: তুলসী, শুক্ল তুলসী।

একটি তুলসী গাছ সাধারনত ৬০-৮০ সে.মি. উঁচু হয়ে থাকে। তুলসী গাছ Lamiaceae (Labiatae) পরিবারের অন্তর্গত একটি সুগন্ধী উদ্ভিদ। এটির কান্ড সরল শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট। পাতা সরল, প্রতিমুখ, কিনারা খাঁজ কাটা।

শরৎ-হেমন্তে ফুল হয়। বীজ চ্যাপ্টা, মসৃণ ও ফিকে লাল বর্ণের। বাংলাদেশের চার প্রকার তুলসীর সন্ধান পাওয়া যায়। যেমন- বাবুই তুলসী, রাম তুলসী, সাদা তুলসী, কৃষ্ণ তুলসী ও বন তুলসী। হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এটি একটি পবিত্র উদ্ভিদ হিসাবে সমাদৃত।
বাংলাদেশের সর্বত্র তুলসী গাছ দেখা যায়। বাড়ীর আশে পাশে লাগানো হয়।

ব্যবহার্য অংশঃ তুলসীর পাতা, বীজ ও রস সব অংশই উপকারী।

প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান:

উদ্বায়ী তেল: তুলসী পাতায় রয়েছে ইউজেনল ও ফিনোলের মতো তেলজাতীয় স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী কিছু উপাদান। এগুলো মূলত উদ্বায়ী তেল। আরো আছে চিত্রনেলল, লিনালল, চিত্রাল, লিমনেন এবং তারপিনিওল। এজাতীয় তেল স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। এ সকল যৌগ প্রদাহজনিত সমস্যা দূর করে এবং ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

তুলসীর বীজ; Image source: chandigarh

ফ্ল্যাভোনয়েড: তুলসীতে রয়েছে জিয়া-জান্থিন যা একটি হলুদ ফ্ল্যাভোনয়েড ক্যারোটিনয়েড। এটি রেটিনাকে সূর্যের ক্ষতিকর অতি বেগুনি রশ্মি হতে রক্ষা করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে সকল ফলমূল ও শাকসবজিতে জিয়া-জান্থিন রয়েছে, সে সকল খাবার শরীরের বার্ধক্যজনিত সমস্যা রোধে সহায়তা করে। বিশেষ করে চোখের বিভিন্ন সমস্যা দূর করে।

ভিটামিন: তুলসীর পাতায় রয়েছে ভিটামিন-এ। এছাড়াও আছে বি-ক্যারোটিন, লুটিয়ান, জিয়া-জান্থিন এবং ক্রিপ্টক্সান্থিন এর মত ফ্লাভেনয়েড। ভিটামিন-এ এর কারনে শ্লেষ্মা ঝিল্লি সুস্থ থাকে এবং ত্বক থাকে সুস্থ। ভিটামিন-এ সুস্থ দৃষ্টির জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে ।

এন্টি-অক্সিডেন্ট: তুলসী গাছের পাতাতে বিভিন্ন পলিফেনলিক উপাদান যেমন- অরিএন্টিন এবং ভিচেনিন রয়েছে। এই যৌগগুলোকে ইন-ভিট্রো পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়। তুলসীতে সম্ভাব্য কিছু অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে, যা যকৃতের জারণ বিকিরণ জনিত সমস্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

এন্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ তুলসী চা; Image source: organicauthority

আরো কিছু অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যৌগ আছে যেগুলো শরীরকে বিভিন্ন রোগের সংক্রামণ হতে রক্ষা করে। প্রতিরক্ষামূলক কাজ করতে সাহায্য করে।

এগুলো ছাড়াও তুলসী পাতায় আছে অ্যালকালয়েড, গ্লাইকোসাইড এবং সাইট্রিক, ম্যালিক ও টার্টারিক এসিড। তুলসী পাতায় ক্যালরির পরিমাণ খুব কম থাকে এবং কোন কোলেস্টেরল থাকে না। কিন্তু এতে অত্যাবশ্যক প্রয়োজনীয় পুষ্টি, খনিজ পদার্থ এবং ভিটামিন রয়েছে। যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী।

শারীরিক সমস্যা রোধে তুলসী:

১) গলাব্যথা ও সর্দি কাশি:
ঋতু পরিবর্তনের সময় ঠাণ্ডা লেগে সর্দি কাশি হয়ে যায় এবং গলা ব্যথার সমস্যাও দেখা দেয়। তুলসী পাতা এই সমস্যা দূর করে। নিয়মিত তুলসী পাতার রস পান করলে ও তুলসী পাতা ফোটানো পানি দিয়ে গার্গল করলে দ্রুত সমস্যার সমাধান পাবেন।

২) হৃদপিন্ডের অসুখ:
তুলসী পাতায় আছে ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই উপাদানগুলো হার্টকে বিভিন্ন সমস্যা থেকে মুক্ত রাখে সহায়তা করে। তুলসী পাতা হার্টের কর্মক্ষমতা বাড়ায় ও এর স্বাস্থ্য ভালো রাখে।

গুড়ো করেও তুলসী খাওয়া হয়; Image source: Indiamart

৩) মাথাব্যথা উপশমে:
অনেক সময় মানসিক চাপ, মাইগ্রেন বা অন্যান্য অনেক কারণেই মাথাব্যথা শুরু হয়ে যায়। মাথাব্যথা থেকে দ্রুত মুক্তি পেতে শুকনো তুলসী পাতা পানিতে ফুটিয়ে এই পানির ভাপ নিন। খুব ভালো ফলাফল পাবেন।

৩) ত্বকের সমস্যায়:
তুলসী পাতার রস ত্বকের জন্য খুবই উপকারী। তুলসী পাতা বেঁটে সারা মুখে লাগিয়ে রাখলে ত্বক সুন্দর ও মসৃণ হয়। এ ছাড়াও তিল তেলের মধ্যে তুলসী পাতা ফেলে হালকা গরম করে ত্বকে লাগালে ত্বকের যে কোনও সমস্যায় বেশ উপকার পাওয়া যায়।

ত্বকের কোনো অংশ পুড়ে গেলে তুলসীর রস এবং নারকেলের তেল ফেটিয়ে লাগালে জ্বালা কমবে এবং সেখানে কোনও দাগ থাকবে না।

ত্বক সুরক্ষায় তুলসী; Image source: Lifealth.com

৪) দাঁতের সমস্যায়:
দাঁতের জীবাণু দূর করতে তুলসী পাতার অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদানের জুড়ি নেই। এছাড়াও মাড়ির ইনফেকশন জনিত সমস্যা দূর করে তুলসী পাতা। সমস্যা দূর করতে শুধুমাত্র তুলসী পাতা চিবিয়ে রস শুষে নিন।

৫) বয়সের ছাপ রোধে:
তুলসী পাতাকে যৌবন চিরকাল ধরে রাখার টনিক ও মনে করেন কেউ কেউ। এটিতে উপস্থিত ভিটামিন সি, ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস ও এসেন্সিয়াল অয়েলগুলো চমৎকার অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের হিসেবে কাজ করে যা বয়সজনিত সমস্যাগুলো কমায়।

৬) জ্বর নিরাময়ে:
১ মুঠো তুলসী পাতা ২ কাপ পানিতে ফুটিয়ে মধু মিশিয়ে চায়ের মতো পান করলে নানা ধরণের জ্বর যেমন ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ইত্যাদি থেকে রক্ষা পেতে পারেন। এছাড়াও সাধারণ ঠাণ্ডা জ্বর হলে তুলসী পাতার চা তা দ্রুত নিরাময়ে সহায়তা করে।

৭) কিডনির সমস্যা দূরীকরণে:
তুলসী পাতার রস দেহ থেকে ক্ষতিকর টক্সিন দূর করার ক্ষমতা রাখে। নিয়মিত তুলসী পাতার রস পান করলে কিডনির সমস্যা, কিডনি ড্যামেজ এমনকি কিডনিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কমে যায়।

৮) মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে:
তুলসীর ভিটামিন সি ও অন্যান্য অ্যান্টি অক্সিডেন্টগুলো মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে। এই উপাদানগুলো নার্ভকে শান্ত করে। এ ছাড়াও তুলসী পাতার রস শরীরের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

৯) কানের সংক্রমণ সারাতে:
অনেক সময় বিভিন্ন কারণে কানের ইনফেকশন সৃষ্টি হয়। যদি প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা করতে চান তাহলে কানে কয়েক ফোঁটা তুলসী পাতার রস ঢেলে দিন। তুলসী পাতার অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিইনফ্লেমেটোরি উপাদান কানের ইনফেকশন ও প্রদাহ দূর করবে।

চমৎকার গুণসম্পন্ন তুলসীর তেল; Image source: Indiamart

১০) পোকার কামড়ে:
তুলসী পাতা হল প্রোফাইল্যাক্টিভ যা পোকামাকড় কামড়ে দিলে উপশম করতে সক্ষম। পোকার কামড়ে আক্রান্ত স্থানে তুলসী পাতার তাজা রস লাগিয়ে রাখলে পোকার কামড়ের ব্যথা ও জ্বলা থেকে কিছুটা মুক্তি পাওয়া যায়।

তাছাড়াও শিশুদের সর্দি-কাশি, পেট কামড়ানি, কাশি, শ্বাসকষ্ট ও লিভারের গোলযোগ, হাঁপানি, ঘামাচি, চুলকানি, হাম, বসন্ত, দাদ ও কৃমিতে তুলসী উপকারী।

মোদ্দাকথা, রোগ নিরাময়ে তুলসী গাছ এক চমৎকারিত্বের নাম।

Feature Image: JustHerbs