আমরা আজকে কথা বলবো হার্ট এট্যাক কী, এটির প্রকারভেদ, ঝুঁকির কারণ, চিকিৎসা, আরোগ্যলাভ এবং প্রতিকারের উপায় নিয়ে।

হার্ট এট্যাক শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর যা মৃত্যুর কারণও হয়ে উঠতে পারে।

করোনারি আর্টারির মাধ্যমে হৃদপিণ্ডে রক্ত প্রবাহিত হয় এবং হৃদপিণ্ড কর্মক্ষম থাকে। কিন্তু করোনারি আর্টারিতে যখন ব্লকেজ তৈরি হয় আমাদের হৃদপিণ্ড তখন আর পর্যাপ্ত রক্তপ্রবাহ পায় না, যার ফলে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূলত এই অবস্থাকেই হার্ট এট্যাক বলে।

হার্ট এট্যাককে মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কসন নামেও ডাকা হয়। করোনারি আর্টারিতে তৈরি হওয়া ব্লকেজ রক্তপ্রবাহকে বাঁধা দিলেই হার্ট এট্যাকের ঝুঁকি তৈরি হয়।

বুকে ব্যথা অনুভূত হয় প্রচণ্ড; Image source: HealthGrade

ব্লকেজ বা প্রতিবন্ধকতা নানা ভাবে তৈরি হতে পারে। যখন চর্বি, কোলেস্টেরল এবং অন্যান্য জিনিস একত্রিত হয়ে ব্লাড ভেসেলে জমা হয় তখন প্ল্যাক সৃষ্টি হয়। এই প্ল্যাক আবার সময়ের সাথে সাথে অণুচক্রিকা মুক্ত করে। অণুচক্রিকা রক্তকে জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। প্ল্যাকের আশেপাশের রক্ত এরা সংগ্রহ করে এবং পরবর্তীতে জমাট বাঁধায়।

ফলে সাধারণ রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে এবং হৃদপেশি আক্রান্ত হয়। ব্লকেজের আকার কত বড় বা ছোট তার উপর হৃদপেশির ক্ষতি নির্ভর করে। ব্লকেজের কারণে রক্ত যখন পরবর্তীতে হৃদপিণ্ডে পর্যাপ্ত পরিমাণে পৌঁছাতে পারেনা এই ক্ষতির পরিমাণ তখন বহুগুণে বেড়ে যায়।

অনেকে সময় কার্ডিয়াক এরেস্টকেও হার্ট এট্যাক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কার্ডিয়াক এরেস্ট হচ্ছে সেই অবস্থা যখন হৃদপিণ্ড আচমকা তার কাজ বন্ধ করে দেয়।

প্রকারভেদ:

তিন ধরণের করোনারি আর্টারি ডিজিজের কারণে হার্ট এট্যাক হতে পারে। যথা –

  • ST সেগমেন্ট এলিভেশন মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কসন (STEMI)
  • নন-এসটি সেগমেন্ট এলিভেশন মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কসন (NSTEMI)
  • করোনারি আর্টারি স্প্যাজম

STEMI

এই ধরণের হার্ট এট্যাকে আর্টারি প্রায় পুরোটাই ব্লক হয়ে যায়; Image source: Piedmont Healthcare

স্টেমি হার্ট এট্যাক মারাত্মক। এক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অনিবার্য। করোনারি আর্টারি যখন সম্পূর্ণ ব্লক হয়ে যায়, হৃদপিণ্ডের বেশিরভাগ অঞ্চলেই রক্ত পৌঁছাতে পারে না তখন এই ধরণের হার্ট এট্যাক হয়। এটি আস্তে আস্তে হৃদপেশিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলে যা একসময় হৃদপিণ্ডের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।

NSTEMI

করোনারি আর্টারি আংশিক ব্লক হলে এবং রক্ত চলাচল গুরুতরভাবে বাঁধা পেলে এটি ঘটে। স্টেমি হার্ট এট্যাকের চেয়ে এটি তুলনামূলক কম বিপজ্জনক হলেও এটিও হৃদপিণ্ডের স্থায়ী ড্যামেজ ঘটাতে পারে।

করোনারি আর্টারি স্প্যাজম

এটিকে নীরব হার্ট এট্যাক বা অস্থিতিশীল এনজাইনা নামেও ডাকা হয়। আর্টারি যখন হৃদপিণ্ডের সংকোচন, রক্ত চলাচলে বাঁধাদানকারী হিসেবে কাজ করে তখন এটি ঘটে থাকে।

সাইলেন্ট হার্ট এট্যাক; Image source: Daily express

অন্যান্য করোনারি ডিজিজ অপেক্ষা এটি কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং স্থায়ী কোনো ক্ষতি ঘটায় না। বদহজমের মতো ছোটখাটো সমস্যা স্প্যাজমের কারণে ঘটতে পারে। তবে এটিও সময়ের সাথে সাথে বড় ধরণের কোনো হার্ট এট্যাকের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

চিকিৎসা

যেকোনো ধরণেরই হোক না কেন সব হার্ট এট্যাকের জন্যই যথোপযুক্ত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। আর তা নির্ভর করবে হার্ট এট্যাকের ধরণের উপর। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় হার্ট এট্যাক কতটা তীব্র তার উপর ভিত্তি করে মেডিকেল ডাক্তাররা চিকিৎসা শুরু করেন। যে যে পদক্ষেপগুলো মূলত নেওয়া হয়:

  • নতুন করে আবার রক্ত জমাট বাঁধার আগেই এসপিরিন দেওয়া
  • অক্সিজেন থেরাপি
  • রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নাইট্রোগ্লিসারিন প্রয়োগ করা
  • বুকের ব্যথা উপশমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

অক্সিজেন থেরাপি; Image source: RT specialist

হার্ট এট্যাকের ধরণ বুঝে যাবার পর সবচেয়ে প্রয়োজনীয় হচ্ছে রক্ত চলাচলকে উদ্দীপ্ত রাখা। করোনারি আর্টারি ডিজিজ যদি কম মারাত্মক হয় তাহলে ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমেই এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

  • ক্লট ব্লাস্টার যেগুলোকে থ্রম্বোলাইটিক মেডিসিনও বলা হয়, মূলত এগুলোই ব্লকেজে জমে থাকা রক্তকে দ্রবীভূত হয়ে যেতে সাহায্য করে।
  • ব্লাড থিনার পরিচিত এন্টিকোয়াগুলেন্ট হিসেবে যা দিয়ে নতুন করে রক্ত জমাট বাঁধা রোধ করা হয়।
  • ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণের ঔষধ যেমন ACE ইনহিবিটর ব্যবহার করা হয় প্রেসার কমিয়ে ব্লাড ফ্লো যথেষ্ট রাখার জন্য।
  • স্টাটিন ব্যবহার করা হয় লো ডেনসিটির লিপোপ্রোটিন কোলেস্টেরল কমিয়ে আনার জন্য।
  • বিটা-ব্লকার কাজ করে হৃদপিণ্ডের কাজের চাপ এবং বুকের ব্যথা কমাতে।

ডাক্তাররা পারকিউটেনাস করোনারি ইন্টারভেনশনও পরিচালনা করেন। এটির মাধ্যমে সরু বা ব্লক হয়ে যাওয়া করোনারি আর্টারিতে একটি সুক্ষ্ম চিকন টিউব বা ক্যাথেটার প্রবেশ করানো হয়। প্রবেশের পর টিউবের শেষ প্রান্তটি তখন স্ফীত করা হয়, ফলে আর্টারির ভেতরে বেশি পরিমাণ জায়গার সৃষ্টি হয়।

তখন রক্ত পুনরায় হার্টের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে চলাচল শুরু করতে পারে। কিছুক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ায় একটি স্টেন্ট প্রবেশ করানো হয়। ধাতুর তৈরি ছোট এই যন্ত্রটি এমনভাবে তৈরি যেন পরবর্তীতে নতুন করে আর কোনো ব্লকেজ তৈরি না হয়।

মারাত্মক কেসগুলো প্রয়োজন হয় সার্জারির। তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হচ্ছে করোনারি আর্টারি বাইপাস যেটির মাধ্যমে ব্লকড আর্টারিকে সরিয়ে তার পরিবর্তে সেখানে শরীরের অন্য কোনো একটি ব্লাড ভেসেলকে ব্যবহার করা হয়। বিশেষত এটি খেয়াল রাখতে হয় ভেসেলটি যেন ব্লকেজের পরিবর্তে হৃদপিণ্ডে পর্যাপ্ত পরিমাণে রক্ত সরবরাহ করতে পারে।

আরোগ্যলাভ

হার্ট এট্যাকের তীব্রতা এবং তার ধরণের উপর নির্ভর করে একজন ব্যক্তি কত দ্রুত আরোগ্য লাভ করবেন।

তবে সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যেই আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক কাজকর্মে নিজেকে পুনরায় নিয়োগ করতে পারে। তবে আক্রমণ মারাত্মক হলে তাতে মাসকয়েকও বিশ্রামে থাকতে হতে পারে।

ঝুঁকির কারণ

হার্ট এট্যাকের ঝুঁকির কারণসমূহ; Image source: Medical Tourism India

কিছু মানুষ হার্ট এট্যাক দ্বারা বেশি আক্রান্ত হয়। যে সমস্ত কারণ এর পিছনে থাকতে পারে:

  • উচ্চ রক্তচাপ
  • স্থুলতা অতিরিক্ত ওজন
  • খাবারে অনিয়ম বিশেষ করে ট্রান্স বা সম্পৃক্ত চর্বি গ্রহন
  • অপর্যাপ্ত শারীরিক শ্রম
  • বার্ধক্য
  • মাদকদ্রব্য গ্রহণ
  • ডায়বেটিস বা হাই ব্লাড সুগার লেভেল
  • পারিবারিক হৃদরোগের ইতিহাস

প্রতিরোধ

নিম্নোলিখিত কাজগুলো করে হার্ট এট্যাকের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব :

  • সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিটের মোটামুটি মানের কিংবা ৭৫ মিনিটের দ্রুতগতির কায়িক শ্রম।
  • উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণে রাখা
  • ধূমপান না করা
  • ফলমূল, শাকসবজি, বাদাম, মাছ, লিগিউম সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া
  • স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা

Feature Image: Miami Dade Country