একজন গর্ভবতী নারীর গর্ভাবস্থার পরিচর্যা বিষয়ক কথা বলার আগে জেনে নিই গর্ভধারণ বলতে কী বুঝায়?

সাধারণত একটি মেয়ের মাসিক শুরু হবার পর থেকে প্রতি মাসে একটি করে ডিম্বাণু পরিপক্ক হয়। মূলত দুই মাসিকের মাঝামাঝি সময়ে যদি যৌন মিলন হয়, তাহলে পুরুষের শুক্রাণু যোনিপথ দিয়ে ডিম্ববাহী নালীতে গিয়ে পৌঁছে। সেখানে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলনের ফলে ভ্রুণ তৈরি হয়। একেই গর্ভধারণ বলে।

এই ভ্রুণ কয়েক দিন পর জরায়ুতে এসে পৌঁছে এবং সেখানে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে শিশুতে পরিণত হয়। গর্ভাবস্থাকে সাধারণত তিনটি ত্রৈমাসিক পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম ত্রৈমাস হলো ১ থেকে ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত এবং এর মধ্যে গর্ভসঞ্চার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দ্বিতীয় তিনমাস হল ১৩ থেকে ২৮ সপ্তাহ পর্যন্ত। এবং তৃতীয় তিনমাস হলো ২৯ সপ্তাহ থেকে ৪০ সপ্তাহ পর্যন্ত।

বেড়ে উঠা ভ্রুণ; Image source: sciencealert

প্রসবপূর্ব পরিচর্যা গর্ভাবস্থার জন্য অত্যন্ত জরুরী।
প্রথমবার গর্ভবতী হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা মেনে চলা প্রয়োজন। শুধু প্রথমবার নয় প্রতিবার গর্ভবতী হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখা জরুরী। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে বাড়তি ফলিক এসিড গ্রহণ, মাদক ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা, নিয়মিত ব্যায়াম, রক্ত পরীক্ষা ও নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা।

গর্ভাবস্থার জটিলতাসমূহের মধ্যে আরো থাকতে পারে গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতা, এবং প্রবল বমির ভাব ও বমি।

নিচে প্রথমবারের মতো গর্ভবতীর সতর্কতাসমূহ উল্লেখ করা হলো:

১) গর্ভবতী কিনা নিশ্চিত হওয়া:

আপনার প্রথম করণীয়ই হবে আপনি গর্ভবতী হয়েছেন কিনা তা নিশ্চিত করা। কারণ কখনো কখনো প্রেগন্যান্সির রিপোর্ট ভুল আসতেই পারে। বাসায় বসে প্রেগন্যান্সি টেস্টের জন্য যে পদ্ধতিসমূহ (যেমন: প্রেগন্যান্সি কিট) অবলম্বন করতে পারেন।

তাছাড়া শারীরিক কিছু উপসর্গ দেখেও বুঝে নিতে পারেন আপনি গর্ভধারণ করেছেন কিনা। যেমন সময় অতিক্রম হওয়ার পরও ঋতুুুস্রাব না হওয়া, হঠাৎ করে করে মনোভাবের পরিবর্তন লক্ষ্য করা, পিঠে ব্যথা অনুভব করা বা টক জাতীয় খাবারের প্রতি আসক্তি তৈরি হওয়া ইত্যাদি। অবশেষে পুনরায় চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করিয়ে নিশ্চিত হতে পারেন।

২) গর্ভাবস্থার দিন হিসাব করা:

সম্ভাব্য তারিখের হিসাব রাখুন; Image source: mitrefinch.com

গর্ভকালীন দিনগুলোর হিসাব রাখা জরুরী। গর্ভাবস্থাকে যে ৩টি ত্রৈমাসিক ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে তার প্রতিটিতেই বিশেষ কিছু পরিবর্তন লক্ষণীয় হয়। প্রথম তিন মাসে হরমোনগত পরিবর্তন, বিপাকীয় পরিবর্তন, রক্তাচাপ জনিত সমস্যা ইত্যাদি হতে পারে। গর্ভাবস্থার দিনগুলোর হিসাব করা এবং ডেলিভারির সম্ভাব্য দিন হিসাবে রাখা জরুরী। ৩৭-৪০ সপ্তাহের মধ্যে সাধারণত ডেলিভারি করানো যায়।

৩) চিকিৎসকের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ:

ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ রাখুন নিয়মিত; Image source: doctoresperati

গর্ভধারণ থেকে প্রসবকাল পর্যন্ত একজন মেয়েকে সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। তবে অনেক দম্পতিই আছেন যারা প্রেগন্যান্সির পরিকল্পনাকাল থেকে চিকিৎসকের সাথে মাসে একবার বা তারচেয়েও কম দেখা করেন। কিন্তু আপনি যখন নিশ্চিত হবেন আপনি গর্ভবতী তখন থেকে নিয়মিত ডাক্তারের সান্নিধ্যে থাকা আপনার অন্যতম একটি কর্তব্য। এই সময়ে সব ধরণের চলাফেরা করতে হয় সাবধানে।

খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারেও থাকতে হয় সতর্ক, মানতে হয় নিয়মকানুন। আর চিকিৎসকই আপনাকে সেই সকল বিষয়ে পরামর্শ দিবেন যেন আপনার এবং আপনার সন্তানের কোনো ক্ষতি না হয়। নয়তো কোনো একটি ছোট্ট ভুলের কারণেও আপনি অথবা আপনার সন্তান কিংবা উভয়েরই ক্ষতি হতে পারে। তাই গর্ভকালীন সময়টাতে প্রতিমাসে ভালো একজন গাইনোকোলোজিস্ট দেখানো দরকার। এই ব্যাপারে কখনো অবহেলা করা উচিত না।

৪) খাবারে আদেশ ও নিষেধাজ্ঞা:

গর্ভধারণের প্রথম ১২ সপ্তাহ অর্থাৎ ফার্স্ট ট্রাইমেস্টারে যা করণীয়- 
এই সময় পাকস্থলীতে বিভিন্ন হরমোনের প্রভাবে খাবার হজম হয় দেরিতে। তাই বারবার খাওয়া উচিত অল্প অল্প করে। পেঁপে, আনারসের মতো ভিটামিন-এ জাতীয় খাবার কম খেতে বলা হয়। কারণ এতে টেরাটোজেনিক এফেক্ট পড়ায় গর্ভপাত হয়ে যেতে পারে। তবে এই সময় বেশি খেলে বাচ্চা বড় হয়।

এই সময়ে কোষ্ঠকাঠিন্যের পরিমাণ বেড়ে যায় বলে অল্প অল্প করে বার বার পানি খাওয়া উচিত। ফাইবার বা আঁশজাতীয় খাবার (যেমন ঢেড়স খুব উপকারী) খেতে হবে।

গর্ভধারণের ১৩-২৮ সপ্তাহ অর্থাৎ সেকেন্ড ট্রাইমেস্টারের সময় তুলনামূলক ঝুঁকি অনেক কম থাকে। সেকেন্ড ট্রাইমেস্টারে প্রোটিন জাতীয় খাবার খাওয়া প্রয়োজন তবে সেটা ২৫ শতাংশের বেশী যেন না হয়। প্রোটিনের পরিমাণ বেশী হলে বাচ্চা মারা যেতে পারে। 

পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য খেতে হবে নিয়মিত; Image source: womanpla

গর্ভধারণের ২৯-৪০ সপ্তাহ অর্থাৎ থার্ড ট্রাইমেস্টারে ফার্স্ট ট্রাইমেস্টারের মতো সুষম খাদ্য খেতে হবে পর্যাপ্ত পরিমাণে তাতে বাচ্চা গাঠনিক আকারে পরিপূর্ণতা লাভ করতে থাকে।

৫) সময়মতো টিকা গ্রহণ:

গর্ভাবস্থায় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা গ্রহণ করতে হবে। ধনুষ্টাংকার, ফ্লু সহ বিভিন্ন রোগের হাত থেকে শিশুকে রক্ষা করার জন্য টিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি এতে গর্ভাবস্থায় মায়েরও কোনো সমস্যা হবে না। এই টিকাগুলো দিলে সহজে আপনি দূর্বল অনুভব থেকে মুক্তি পাবেন তেমনি শারীরিক ও মানসিকভাবেও হবেন উপকৃত।

তাই গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা গ্রহণ করুন। নয়তো জন্মানোর সময়ই শিশু শারীরিক অসুস্থতা নিয়েই জন্মাতে পারে। কারণ গর্ভাবস্থায় মায়ের স্বাস্থ্যের প্রভাবই শিশুর উপর পড়ে বেশি।

বিশেষ টিপস:

  • প্রথম ছয়মাস যৌন মিলন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা উচিত। তা নাহলে প্রি-ম্যাচিওরড বেবি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমনকি গর্ভপাতও হতে পারে।
  • অতিরিক্ত বিশ্রামে থাকা উচিত নয়। ঘরের সহজ ও টুকিটাকি কাজ করা, শরীরকে নাড়াচাড়ার মধ্যে রাখা উচিত। হাঁটাচলাতে থাকতে হবে যতটুকু সম্ভব।

বাচ্চার স্বাভাবিক নড়াচড়া খেয়াল করতে হবে; Image source: momfunction

  • এই সময় বাচ্চার নড়াচড়া নজরে রাখা জরুরী। প্রথম ১২ ঘন্টায় অন্তত ১০ বার বাচ্চার মুভমেন্ট হতে হবে। 
  • প্রথম তিনমাসের মধ্যে বমি, ব্লিডিং, ইউনারি ইনফেকশন, জ্বর ও ডায়েরিয়া হতে পারে। এই সময় জল ভাঙলে, ব্লিডিং হলে, যন্ত্রণা হলে অবশ্যই দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
  • ৩৭ সপ্তাহের আগে জন্ম গ্রহণ করা শিশুরা হলো অকালজাত এবং তারা সেরিব্রাল পালসির মতো শারীরিক সমস্যার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।
  • অন্য কোনো চিকিৎসাগত কারণ না থাকলে ৩৯ সপ্তাহের আগে প্রসব কৃত্রিমভাবে শুরু না করার সুপারিশ করা হয়, তা সেটি প্রসব বেদনা শুরু করানো মাধ্যমে অথবা সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে যেভাবেই করা হোক না কেন।

Feature Image: Cosmopolitan