রাকিবের মনে হচ্ছে বেঁচে থাকার আর কোনো প্রয়োজন নেই তার। মা মরে গেছে বেশ কয়েক দিন হয়ে এলো। বাবা তার চাকরি নিয়েই ভীষণ ব্যস্ত তাই সারাক্ষণই তার মেজাজ খিটখিটে আর ক্লান্ত দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে সে। যখনই বাবা-ছেলের কথোপকথন হয় তা শেষ হয় চিল্লাচিল্লি দিয়ে। এরইমধ্যে রাকিব দেখলো সে তার গণিত পরীক্ষায় খারাপ করেছে। বাবাকে তখন থেকে আরো ভয় করতে শুরু করলো যে বাবা জানতে পারলে তার কি দশাটাই না করবে!

মায়ের কথা এখন প্রতিবার মনে পড়ছে তার। মা থাকলে মুখ ফুটে কতকিছু বলা যেত তাকে! রাকিব জানতো বাবা তার বন্দুকটা কোথায় রাখে। কিন্তু যে ই সে ক্যাবিনেট খুলে তা নিতে গেলো ছোট বোনের পায়ের আওয়াজ পেলো, স্কুল থেকে ফিরেছে সে। সে কারো সামনে নিজের আত্মাহুতির প্রমাণ রাখতে চায়নি বলে তখনের মতো বন্দুকটা আবার রেখে দিয়ে টিভি দেখতে বসে গেলো।

পারিবারিক সমস্যার কারণে আত্মহত্যাবোধ প্রকট হয়ে উঠে ; image source: thetruthaboutguns

পরে যখন হঠাৎ তার খেয়াল হলো নিজের জীবনের শেষ পর্যায়ের কতটা কাছে চলে এসেছে সে রাকিব ভীত হয়ে পড়লো খুব! সিদ্ধান্ত নিলো যে করেই হোক সাহস জুগিয়ে বাবার সাথে কথা বলতে হবে তাকে। সেদিন অনেকক্ষণ কথা বলার পরই সে বুঝতে পেরেছিলো বাবা তাকে কতটা ভালোবাসে! সাথে এটাও বুঝতে পারলো নিজের জীবনকে সে ভালোবাসে। এভাবে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কোনো মানে হয় না। মাথা থেকে সব বাজে চিন্তা ছুঁড়ে ফেলে দিলো।

এটা একটা গল্প যা বাস্তবে প্রতীয়মান হচ্ছে অহরহ। চলুন এবার মূলকথায় যাই।

কখন কিশোররা আত্মহত্যার পথে এগিয়ে যায়?

অধিকাংশ কিশোরই যারা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলো একটি সাক্ষাৎকারে জানায় তারা এই অবস্থার দিকে এগিয়েছিলো কারণ তাদের মনে হচ্ছিলো তখনকার বর্তমান অবস্থার সাথে আর পেরে উঠা যাচ্ছে না। দুশ্চিন্তা, সমস্যা এবং বাজে অনুভূতিগুলো প্রকটভাবে আকড়ে ধরেছিলো। রাকিবের মতো অনেকেই কোনো উপায় পাচ্ছিলো না এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাবার। তাতেই মনে হচ্ছিলো মরে যাওয়া ছাড়া আর বুঝি কোনো রক্ষা নেই।

বাংলাদেশে আত্মহত্যার সংখ্যা, ২০১৭ : Image source; Bangladesh Tribune

কিছু মানুষ যারা সুইসাইড এটেমপ্ট করে থাকে তারা মনে করে অনুভূতির প্রত্যাখ্যান, আঘাত কিংবা ক্ষতি থেকে পরিত্রাণ পাবার এই একটাই বুঝি উপায়! কেউ কেউ আবার রাগ, লজ্জা কিংবা নিজেকে দোষী ভাবা থেকেও এই চেষ্টা করতে পারে। তারা তাদের পরিবার কিংবা বন্ধুদের থেকেও হতাশ হয় এবং চিন্তিত হয়ে পড়ে। এইসব সমস্যা মোকাবেলা করার ক্ষমতা হারিয়ে নিজেরাই যখন ভেতরে ভেতরে পুড়তে থাকে তখনই তারা সুইসাইডের দিকে এগিয়ে যায়।

আমরা প্রায় সবাই ই জীবনের একটা পর্যায়ে খুব খারাপ একটা সময় অতিবাহিত করি। কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে আমরা তা কাটিয়ে উঠি নতুন প্রত্যয় ও আশা, স্বপ্ন দেখার মাধ্যমে। তাহলে যে মানুষটি সুইসাইড করতে যাচ্ছে সে কেন পারবে না এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে? অন্য মানুষগুলো সুস্থির থাকতে পারলে সে কেন পারবে না? কোন জিনিসটি মানুষটিকে এত অসহায় করে তুলে যে তার আর বাঁচতেই ইচ্ছে করে না?

এই সবগুলো প্রশ্নের পেছনে যে উত্তরটি লুকিয়ে আছে তা হচ্ছে ‘বিষণ্ণতা’

বিষণ্ণতা

বিষণ্ণতা মূলত মানুষকে ব্যর্থতা আর হতাশার দিকে ধাবিত করে। পরিস্থিতির নেতিবাচক দিকটাকেই বড় করে তুলে এবং মানুষকে তার ক্ষমতার গুণাবলী থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যারা তীব্র বিষণ্ণতায় ভুগে তারা মনে করে থাকেন ইতিবাচক বলে আশেপাশে কিছু নেই এবং তারা কোনভাবেই সুখী হতে পারবেন না, এহেন কাজকিংবা কোনো বস্তু নেই যা তাদেরকে সুখী করতে পারবে।

বিষণ্ণতা হচ্ছে আত্মহত্যার প্রধান কারণ : Image source ; meant to be happy

মাঝেমধ্যে দেখা যায় যারা আত্মঘাতী চিন্তা করে থাকেন তারা নিজেরাও জানেন না যে তারা বিষণ্ণতায় ভুগছেন। বিষণ্ণতা সম্পর্কে তারা অসচেতনও হতে পারেন। প্রতিটি বিষয় তাদের কাছে এমন হয়ে দাঁড়ায় যে ‘আর কোনো উপায় নেই’, ‘এটা কখনো আর ভালো হবে না’, ‘আমার করার আর কিছু রইলো না’

কেউ যখন বিষণ্ণতায় ভুগেন, সঠিক থেরাপি এবং চিকিৎসার মাধ্যমে তার চিন্তা-ভাবনাগুলো পরিষ্কার করা সম্ভব। তখন মানুষটি আবার আগের মতো আনন্দ, শক্তি এবং আশা খুঁজে পেতে পারেন। কিন্তু কেউ যখন মারাত্মক রকমের বিষণ্ণ হয়ে পড়েন, আত্মহত্যাবোধ তার মধ্যে প্রবলভাবে গড়ে উঠে।

বিষয়বস্তুর অপব্যবহার

যে কিশোররা এলকোহল এবং ড্রাগের সাথে সংযুক্ত তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায় সবচেয়ে বেশি। মাদকদ্রব্য সাধারণত মস্তিষ্কের উপর বিষণ্ণতার প্রভাব ফেলে। তাই এইসব জিনিসের অপব্যবহার আত্মঘাতী মনোভাব বৃদ্ধির অন্যতম নিয়ামক হয়ে উঠে।

মাদকদ্রব্য হচ্ছে আত্মহত্যার অন্যতম নিয়ামক ; image source : opaz.rs

বিশেষত যে শিশু বা কিশোর-কিশোরী নিজেদের শারিরীক প্রতিবন্ধকতা, পরিবারের ইতিহাস কিংবা জীবনের অন্যান্য পর্যায় নিয়ে হতাশ থাকে তারাই মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি এবং এভাবেই বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ।

আত্মহত্যা সবসময়ই পরিকল্পিত নয়

মানুষ যে সবসময়ই পরিকল্পিতভাবে আত্মহত্যা করে তা নয়। অনেক সময়ই সুইসাইড এটেম্পট হয় ঝোঁকের বশে যখন অনুভূতি হুট করেই আছড়ে পড়ে। সাধারণত একটি সম্পর্কের বিচ্ছেদ, বাবা-মায়ের সাথে সাংঘর্ষিক যুদ্ধ, অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ, কারো দ্বারা অপদস্ত কিংবা শিকার হওয়ার কারণে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। কিছু মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করে কারণ তারা মরে যেতে চায় কিন্তু কিছু মানুষ সত্যিই মরে যেতে চাচ্ছে কিনা তা সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত না হয়েও আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যায়।

তাদের কাছে সুইসাইড এটেম্পট করা হচ্ছে তাদের গভীর ব্যথার অনুভূতির একটি প্রকাশ। তারা সত্যিই কেমন বোধ করছে তা বলতে পারে না শুধু এটা জানে এমনটি করে কারো কাছে তার অনুভূতির একটি বার্তা পৌঁছানো যাবে। এবং দুঃখজনকভাবে তাদের অনেকেই নিজেরা নিজেদেরকে হত্যা করছে বুঝার আগেই মৃত্যুবরণ করে নেয়।

কী করবেন যদি সে আপনার পরিচিত হয়?

প্রথমেই উচিত হবে তার সাথে আপনি সুন্দর একটি কথোপকথন তৈরি করুন যাকে আপনি সন্দেহ করছেন যে সে আত্মহত্যাবোধ পোষণ করছে। তাকে নিশ্চিত করুন সে একা নয়, তাকে ভরসা দিন। সমস্যাগুলো খুলে বলার অনুরোধ করুন, যত্ন নিয়ে শুনুন এবং বুঝার চেষ্টা করুন।

যদি প্রয়োজন হয় আপনি সুইসাইড ক্রাইসিস লাইনে (যেমন, ১-৮০০-সুইসাইড) কল করতে পারেন কিংবা স্থানীয় ইমার্জেন্সি নাম্বারে (৯১১)

সমস্যা থেকে সামলে উঠুন

আনন্দের সাথে বেঁচে থাকুন ; image source : social news paper

কৈশোর খুব সহজ কিছু নয়। এখানে নানা রকম সামাজিক, কেতাবি এবং ব্যক্তিগত চাপ থাকে। এগুলোর পাশাপাশি আরো নানান চাপে জর্জরিত একজন কিশোর সহজেই অপরাধ এবং অবমাননাকর পরিবেশের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। এক পর্যায়ে এসে নিজের সাথেই হাঁপিয়ে উঠে।

তাই তাদেরকে সুন্দরভাবে গড়ে উঠার দায়িত্বটা নিবেন বাবা-মা ই। বুঝাবেন জীবন কোনো ফুলশয্যা নয়, সমস্যা থাকবেই, মনোবল দৃঢ় রেখে কিভাবে সেগুলো মোকাবেলা করে যেতে হবে একের পর এক।

Feature Image : 247wallst