অস্থিরতা হচ্ছে বর্তমানের অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ আর ঘুমের অভাব এটিকে আরো খারাপ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। আধুনিক জীবনে আমাদের মাঝে নানা ধরণের ক্ষোভ বা বিক্ষেপ লক্ষ করা যায়।

আপনি যদি আপনার স্মার্টফোনে এই আর্টিকেলটি পড়ে থাকেন তাহলে তো একটা সুযোগ থেকেই যায় চ্যালেঞ্জটি নিয়ন্ত্রণ করার। অস্থিরতার কারণ হিসেবে কোনটি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে? তা হচ্ছে ঘুমের অভাব। সম্প্রতি ঘুমের অপ্রতুলতা নিয়ে করা এক গবেষণায় জানা গেছে কিভাবে ঘুমের অভাব অস্থিরতাকে প্রভাবিত করে।

বিশালাকারের এই জরিপটিতে দেখা গেছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানো ব্যক্তির তুলনায় ঘুম থেকে বঞ্চিত ব্যক্তি তার চারপাশ নিয়ে অতিরিক্ত খারাপ সময় পার করে এবং অস্থির চিত্তের মতো আচরণ করে। আমাদের অনেকের সাথেই সচরাচর এটি হয়ে থাকে বলে ক্ষোভ বা অস্থিরতাকে আমরা ছোট কোনো সমস্যা মনে করি। ছোট্ট একটি ইনকামিং ই-মেইল ও সঠিক সময়ে কাজ সম্পন্ন করা থেকে আমাদেরকে ছিটকে দেয়।

ক্লান্ত মানুষ | © gulfhearingaid

যে বই বা আর্টিকেল আমরা পড়ছি তার নানারকম বার্তা নিজেদের স্থিরাবস্থার বিচ্যুতি ঘটায়। কিন্তু উন্মত্ততা বিষয়টা আসলেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা কারণ এটি আমাদের কার্যক্ষমতা, যথাযথতা এবং নিরাপত্তা নষ্ট করে দেয়। পরিমাণের চেয়ে কম ঘুম যেভাবে আপনার উন্মত্ততাকে প্রভাবিত করে তা নিয়ে সম্প্রতি গবেষণায় কিয়দাংশ নিয়ে এখানে আলোচনা করা হলো।

পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব অস্থিরতাকে বর্ধিত করে

মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী ঘুম কম হওয়ার কারণে মানুষদের উপর যে প্রভাব পড়ে তা নিয়ে বিশেষভাবে গবেষণা করেন। কিছু দিক নির্দেশনা এবং ধারাবাহিক কিছু প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট করে তারা পরীক্ষা করতে চেয়েছেন কম ঘুমানো ব্যক্তির সে অনুযায়ী কাজ করার সামর্থ্য কেমন।

সন্ধ্যার দিকে স্লিপ ল্যাবে মোট ২৩৪ জন মানুষের উপর পরীক্ষাটি চালানো হয়। রাত ১০ টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তাদের প্রত্যেককে পদ্ধতিগত নির্দিষ্ট কিছু কাজ সম্পন্ন করার জন্য দেওয়া হয়। কাজ করার সময়টায় তারা পর্যায়ক্রমে কিছুক্ষণ পর পর বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের এই পুনরাবৃত্ত অস্থিরতা বা বিচ্যুতির কারণে তাদেরকে কাজটি সম্পন্ন করার জন্য পুনরায় শুরু করতে হচ্ছিলো।

তন্দ্রালু অনুভব করা | © dissolve.com

তারপর মধ্যরাতে তাদের মধ্যে অর্ধেককে বাড়িতে গিয়ে ঘুমিয়ে যেতে বলা হয় এবং বাকি অর্ধেককে বলা হয় রাতের বাকি অংশটা স্লিপ ল্যাবে সজাগ থেকে কাটিয়ে দিতে। পরবর্তী সকালে পুনরায় সকল অংশগ্রহণকারীকে স্লিপ ল্যাবে জড়ো হতে বলা হয়। সেখানে গবেষকরা পর্যাবৃত্ত বাঁধা সম্বলিত পদ্ধতিগত একই কাজটি তৈরি করে রাখেন।

রাতের পূর্বেই প্রত্যেকে গবেষকদের সেই নিখুঁত কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করে ফেললো। পরদিন সকালে গবেষকেরা যাচাই বাছাই শুরু করলেন এবং ধরা পড়লো অন্যরকম একটি বিষয়। যারা এর আগের রাত বিশ্রাম বা ঘুমিয়েছিল তাদের কার্যক্রমের সাথে না ঘুমানো ফলের একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য।

যাদেরকে ঘুমাতে দেওয়া হয়নি তাদের প্রায় ১৫ শতাংশ ব্যর্থ হয়েছিলো কাজটি সম্পন্ন করতে অপরদিকে ঘুমানোর দলের মধ্যে যা মাত্র ১ শতাংশ! তাছাড়াও না ঘুমানোর দলটিকে অন্যদের চেয়ে বহু সংখ্যক বার ভুল করে কাজটি সম্পন্ন করতে হয়েছে।
তাই বারবার ভুল করার ফলে বাকিদের চেয়ে তাদের সময়ও লেগেছে বেশি।

ঘুম-সংক্রান্ত উন্মত্ততার ফলাফল

নতুন এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন ঘুম থেকে বঞ্চিত মানুষের যে উত্তরোত্তর অস্থিরতা দেখা যায় তার সাথে একটা জ্ঞানীয় দক্ষতা জড়িত ছিলো যাকে বলা হচ্ছে ‘মেমরি মেইন্টেনেন্স’ বা স্মৃতি রক্ষণাবেক্ষণ।
এটা হচ্ছে আমাদের সেই ক্ষমতা যা দ্বারা আমরা প্রাসঙ্গিক তথ্যাদি স্মৃতিভাণ্ডারে সংরক্ষণ করি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ফিরিয়ে এনে কাজে লাগাই।

কর্মক্ষেত্রে প্রভাব | © mattreshelp

এই গবেষণাটিতে বলা হয়, কম ঘুমানো ব্যক্তিদের মেমরি মেইন্টেনেন্সে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তারা কোথায় কাজটি মাত্রই বন্ধ করলো এবং পুনরায় কোথা থেকে শুরু করবে সেটাতে মনোযোগ রাখতে পারছে না ফলে কাজে ভুল হচ্ছে বারেবারে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এই স্মৃতি রক্ষণাবেক্ষণের প্রভাব বিশাল পরিমাণে লক্ষণীয়।

গবেষণাটির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হোন যে ঘুম কম হওয়ার কারণে ছোট ছোট বিক্ষেপ থেকে বড় ধরণের জটিলতা তৈরি হয় আমাদের দৈনন্দিন জীবনে। কমে যায় কার্যক্ষমতা। কেউ মাথা হেলিয়ে রাখে তাদের অফিস টেবিলে। কিছুক্ষণের প্রজেক্ট নিয়ে বসে থাকতে হয় অনেকক্ষণ। যখন আমরা নিদ্রাহীনতা নিয়ে কথা বলছি তখন বলতে হয় নিরাপত্তা হচ্ছে অন্যতম বড় ইস্যু।

যারা জনগণ নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবহন ব্যবস্থায় কাজ করেন তাদের কাছে উন্মত্ততা মানে জীবন মরণের প্রশ্ন। যারা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে গাড়ি চালানোতে অভ্যস্ত তাদের ব্যাপারেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ডের মতে ঝিমানো বা অস্থির ড্রাইভিং বছরে ১,০০,০০০ টিরও বেশি গাড়ি দুর্ঘটনার কারণ।

ঘুম এবং স্মৃতির মধ্যকার সম্পর্ক

ঘুম এবং স্মৃতির সমন্বয়সাধন | © Boston University

বৈজ্ঞানিক গবেষণা দেখিয়েছে ঘুম এবং স্মৃতির মধ্যে ক্ষমতাশালী একটি যোগাযোগ আছে। গুণ মান সম্পন্ন এবং বলবর্ধক ঘুম আমাদের মষ্তিষ্ককে স্মৃতি তৈরি এবং সংরক্ষণ করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে ঘুমের অভাব, বিশ্রামহীন ঘুম বা ক্ষীণ মানের ঘুম স্মৃতি তৈরিতে ব্রেইনকে দুর্বল করে তোলে, কোনো কিছু শেখা, সংরক্ষণ এবং তথ্য উদ্ধারকে কঠিন করে তোলে।

উন্মত্ততার সাথে যেভাবে আপনার সমঝোতা করা লাগবে

উন্মত্ততা থেকে দূরে থাকতে যেগুলো আপনার মনে রাখা উচিত বলে মনে করি :

পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমান

আপনি জানতেন এটাই বলতে যাবো, তাই না? ঠিক, সম্প্রতি গবেষণা শেষে গবেষকেরা এই পরামর্শই দিয়েছেন। ঘুমানোর জন্য সময়মত বিছানায় যেতে হবে তাহলেই ঘুমানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় পেয়ে যাচ্ছেন আপনি। (রাতে মূলত আমাদের ৭/৮ ঘন্টা ঘুম প্রয়োজন হয়) অভ্যাসটি নিয়মিত গড়ে তোলার চেষ্টা করুন।

যখন নিদ্রাহীনতায় ভুগবেন, গাড়ি চালাবেন না

তন্দ্রালু অবস্থায় গাড়ি চালানো | © sleeppreviewmag

এটি হচ্ছে অন্যতম আরেকটি ভিত্তিগত উপদেশ।
আপনার নিরাপত্তা এবং অন্যদের নিরাপত্তা এটির উপরইই নির্ভর করে। 

সময় জটিলতায় ভুগলে সময়সূচি তৈরি করুন, কাজে মনোযোগ দিন

নিদ্রাহীনতা নিয়ে আপনি কাজে যতই মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করবেন না কেন আপনার কিছু না কিছু ভুল হবেই। তাই পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন, কাজে মনোযোগ দিন, দ্রুত কাজ শেষ করার আনন্দ উপভোগ করুন।