আজকাল সাইকো থ্রিলার তথা মানসিক রোগীদের নিয়ে বিভিন্ন রোমাঞ্চকর গল্পগুলো সব বয়সী মানুষের কাছেই বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। কিন্তু বাস্তবে মানসিক রোগীদের কার্যক্রম কি সত্যিই সবাই পছন্দ করেন? নাকি মানসিক রোগীদের উদ্ভট কার্যকলাপে কেবল এমন ব্যক্তিরাই আকৃষ্ট হন যারা নিজেরাও মানসিক রোগী?

২০০৫ সালে স্কট পিটারসন নামক এক ব্যক্তি নিজ হাতে তার স্ত্রী ও সন্তানকে খুনের দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত হন। মৃত্যুদণ্ড পাবার কয়েক ঘন্টা পর তিনি একজন মহিলার কাছ থেকে বিয়ের প্রস্তাব পান এবং পরবর্তী এক দিনের মধ্যে কারারক্ষক প্রায় ৩০টি ফোন পান যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভদ্রমহিলাগণ পিটারসনকে ভালোবাসার বার্তা পাঠান। জানা যায়, অনেক ভালোবাসার চিঠিও পেয়েছিলেন পিটারসন।

স্কট পিটারসন, Source: psychologytoday.com

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা কাকতালীয় ঘটনা নয়। এরকম মানসিক রোগীদের অনেক ভক্ত, শুভাকাঙ্ক্ষী এমনকি ভালোবাসার মানুষ থাকা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের ভাষায় এটিও একটি রোগ যাকে বলা হয় হাইব্রিস্টোফিলিয়া (Hybristophilia)। এ ধরনের রোগীরা অপরাধীদের প্রতি বেশি আকর্ষণ অনুভব করেন। এ কারণে দেখা যায়, বিভিন্ন অপরাধীদের আনাগোনা যে সাইটে বেশি থাকে সেখানে ডেটিং, চ্যাটিং ইত্যাদির বিজ্ঞাপনও বেশি থাকে। কিন্তু অপরাধীদের প্রতি এমন ভালোবাসার আকর্ষণ অনুভব করার কারণ ঠিক কি হতে পারে?

মানসিক রোগীরাই কি মানসিক রোগীদের প্রেমে পড়েন? Source: theredlist.com

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্রত্যেকের মানুষের মধ্যেই কোনো না কোনো মানসিক রোগ আছে। মানসিক রোগ যাচাই করার জন্য সবচেয়ে বেশি মানুষের উপর যে পরীক্ষাটি চালানো হয়েছে তার নাম হলো সাইকোপ্যাথিক পার্সোনালিটি ইনভেন্টরি (Psychopathic Personality Inventory)।

এ পরীক্ষায় সাধারণত মানুষের ২ ধরনের বৈশিষ্ট্যকে যাচাই করা হয়। প্রথম বৈশিষ্ট্যটিকে বলা হয় ফিয়ারলেস ডোমিনেন্স (Fearless Dominance)। এ বৈশিষ্ট্যের কারণে মানুষের মধ্যে অনুতাপের অনুভূতি কম হয়। এছাড়া প্রবল মানসিক শক্তি ও সাহস থাকায় এ ধরনের মানুষের পক্ষে যেকোনো কাজ অনায়াসে করে ফেলা সম্ভব হয়। এমনকি দণ্ডনীয় কোনো অন্যায় করে ফেললেও এদের মধ্যে কোনো প্রকার অনুতাপ জন্মায় না।

একজন মানসিক রোগী, Source: arte.tv

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি হলো সেলফ সেন্টার্ড ইম্পালসিভিটি (Self Centered Impulsivity)। এ ধরনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিরা নিজেকে নিয়ে সবসময় ব্যস্ত থাকেন। অন্যদের থেকে কীভাবে কোনো স্বার্থসিদ্ধ করা যায় সেটা নিয়েই সবসময় ভাবতে থাকেন। এর ফলে এরা অন্যের ক্ষতি করতেও কোনো অপরাধবোধ অনুভব করে না।

যদি কারো মধ্যে এই দুটো বৈশিষ্ট্যের কোনো একটি বৈশিষ্ট্য বেশি মাত্রায় থাকে তবে তাকেও সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ বলা যায় না। কিন্তু যদি কারোও মধ্যে এই দুই ধরণের বৈশিষ্ট্যই প্রবল মাত্রায় থাকে তবে তার মধ্যেই নানারকম অস্বাভাবিক চিন্তাভাবনা এবং কার্যকলাপ দেখা যায় যাকে মানসিক রোগ বলা হয়ে থাকে। এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, যারা এই মানসিক রোগীদের প্রেমে পড়েন, তারাও কি মানসিক রোগী?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য মনোবিজ্ঞানী অ্যাশলে ওয়াট ও তার সহকর্মীরা একটি গবেষণা চালান। এর জন্য তারা প্রায় ৭০ জন নারী ও পুরুষ মানসিক রোগীদের বিভিন্ন মানসিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলাদাভাবে পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণ করেন। এর ফলাফল হিসেবে মনোবিজ্ঞানীরা কিছু প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে জানান যেগুলো এখানে উল্লেখ করা হলো ।

সাধারণ মানুষ কি বিপরীত লিঙ্গের মানসিক রোগীর প্রতি আকৃষ্ট হন?

সুখী দম্পতি, Source: focusonthefamily.com

গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, স্বাভাবিক মানুষদের ক্ষেত্রে মানসিক রোগীদের প্রতি কোনো রকম আকর্ষণ পরিলক্ষিত হয়নি। আবার যে সকল রোগীদের মধ্যে সেলফ সেন্টার্ড ইম্পালসিভিটি বেশি দেখা দেয় তাদের মধ্যে বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা বা চাহিদাও কম দেখা যায়। তবে যাদের মধ্যে ফিয়ারলেস ডোমিনেন্স বৈশিষ্ট্যগুলো বেশি রয়েছে তাদের প্রতি বিপরীত লিঙ্গের আকর্ষণ বেশি দেখা যায় বিশেষত তাদের আত্মবিশ্বাস এবং সাহসিকতার জন্য।

তাহলে মানসিক রোগীরাই কি অন্য মানসিক রোগীদের প্রতি আকৃষ্ট হন?

বিভিন্ন রকম মানসিক রোগের সাথে আবেদন অনুভূতির একটি সংযোগ রয়েছে। শুধু মানসিক রোগ নয়, বিভিন্নরকম ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যা (পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার) যেমন আত্মকেন্দ্রিকতা, ভীতি, নাটকীয়তা, বৈপরীত্য, হতাশা ইত্যাদি সমস্যা যাদের রয়েছে তারা একই সমস্যার বিপরীত লিঙ্গের কারও প্রতি আকর্ষণ অনুভব করতে পারেন।

মানসিক রোগীদের প্রতি বাড়িয়ে দিন সাহায্যের হাত, Source: wallpapers13.com

তবে অনেকে ভেবে থাকেন, নারী মানসিক রোগীরাই হয়তো পুরুষ সাইকোদের প্রেমে বেশি পড়ে থাকেন। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায়, লিঙ্গের উপর এই আকর্ষণ নির্ভর করে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, মানসিক রোগীরা নিজেরা যে সমস্যা বা সীমাবদ্ধতায় ভোগেন, বিপরীত লিঙ্গের কাউকে একই সমস্যায় ভুগতে দেখলে ঐ ব্যক্তিটির প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ জন্মে থাকে। তবে এটাও নিশ্চিত যে, এই আকর্ষণ কেবল রোগীটির প্রতিই হয়ে থাকে, রোগটির প্রতি নয়।

তবে গবেষণার ফলাফল যাই হয়ে থাকুক, বাস্তবতা কেবল এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এমন অনেক উদাহরণ দেখা যায়, স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে যেকোনো একজনের মানসিক সমস্যা রয়েছে এবং অপরজন সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ। কিন্তু ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের কারণে তারা একে অন্যের অস্বাভাবিকতাকে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেছেন। তাই মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণা যাই বলে থাকুক, একটি সুন্দর স্বাভাবিক সম্পর্কের জন্য চাই যথার্থ দায়িত্ববোধ। তাহলেই ওপর পাশের মানুষটি মানসিক রোগী হোন বা স্বাভাবিক মানুষ, আপনি প্রেমে পড়তে পারেন বারবার।

Featured Image: wichitahauntedhouses.com