“আমার দাদা বলতেন কেউ যখন মরে যায় তাকে কিছু জিনিস পিছনে ফেলে যেতেই হয়। একটি শিশু বা একটি বই, একটি চিত্র বা একটি বাড়ি বা তৈরিকৃত একটি দেয়াল বা তার একজোড়া জুতো। কিংবা তার চাষাবাদকৃত বাগান।

যে জিনিসগুলোতে তুমি স্পর্শ করেছো, তোমার মৃত্যুর পর কোনো এক ভাবে সেগুলোতে তোমার আত্মা থেকে যায় আর তোমার কাছের মানুষজন যখন এটির দিকে তাকায় যেমন ধরো হতে পারে একটি গাছ কিংবা এটির ফুল যা তুমি লাগিয়েছো, তখন তারা মনে করে তুমি সেখানে আছো।

তিনি আরো বলেছিলেন, তুমি কি করো এটা কোনো ব্যাপার না, যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি কোনো একটা কিছুকে এমনভাবে পরিবর্তিত করবে যে তুমি স্পর্শ করার পর এটা অন্যকিছুতে রূপ নিয়েছে যেটা আগে এমন ছিল না বা তুমি হাত সরিয়ে নিলেও এটা এমনই থেকে যাবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বাগানের লন যে কাটে সে আর একজন প্রকৃতি মালী দুইজনেই বাগান স্পর্শ করে থাকে কিন্তু বাগানটি জুড়ে সেই লন কর্তনকারী ততক্ষণ থাকে না যতটা মালী মানুষটি ছুঁয়ে থাকে।’

― রে ব্রেডবুরি, ফারেনহাইট ৪৫১

জন্ম নেওয়া মানেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়া; Image source : Al News

কিছু সমাজে প্রায় সবাই ই নিদারুণ দারিদ্রতার উপহাসে মৃত্যুবরণ করে। কেউ শারীরিকভাবে নিঃশেষ হতে হতে অথবা পারিপার্শ্বিকতার বেড়াজালে বেঁচে থাকার সাধ তাদের নষ্ট হয়ে আসে। এই অবস্থায় মৃত্যু তখন তার কাছে সমস্যা হয়ে আসে না। অনেক সমাজেই বয়স্ক মানুষের মৃত্যুকে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। ঐতিহ্যবাহী সমাজগুলোতে এটা একটা ধারাবাহিকতা হয়ে জয়ী হয়ে আছে যে প্রিয় কোনো মানুষের হারিয়ে যাওয়াটাকে মন থেকে মুছে ফেলা এবং তার কাজগুলোকে পরবর্তী প্রজন্মকে দিয়ে টেনে সামনে নিয়ে যাওয়া।

বয়স যখন দিন দিন ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে মানুষ তখন সামাজিক শ্রেণীতে উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভর হয়ে পড়ে। শারীরিকভাবে পরিশ্রমকারীরা দ্রুত মারা যায় যাদের কাজের ধরণটাই নাকি এমন! তাদের মৃতের সংখ্যাটাও বেশি। কারণ তাদের শরীর তখন নানাবিধ রোগ, অনুর্বরতার বাসা বেঁধে অপরাধী হয়ে উঠে। কিংবা বৃদ্ধ বয়সে তাদেরকে সম্মুখীন হতে হয় দারিদ্রতা,অসুবিধা, অনিরাপদ বসবাস, একাকীত্ব এবং ব্যর্থতার গ্লানিতে এই ভেবে যে অন্যরা জীবনে কী অর্জন করলো আর সে নিজে জীবনে কী কী পারলো না সেই হিসাব নিকাশে!

খ্রিস্টান ধর্মীয়দের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ; Image source : tinycards

এই মানুষগুলোর জন্য সহায়ক এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে যৌথ পরিবারগুলো। ঐতিহ্যবাহী সমাজে যেখানে পূর্বপুরুষের রীতিনীতি প্রবল যেমন চীন এবং ভারত, সেখানে জীবিত মানুষগুলো প্রতিফলকে (কোনো কাজের জন্য প্রাপ্য পুরস্কার/তিরস্কার) ভয় করে, ভয় করে কবরে শুয়ে থাকা আত্মাকে। তাই তারা জীবিতদেরকে উৎসাহিত করে ঐতিহ্যবাহী রীতিতে নিয়ম কানুন মেনে বিশ্বস্ততার সাথে জীবনযাপন করতে।

বর্তমান সময়ের আগে মানুষ মৃত্যুকে গলাগলি করেই বেঁচে থাকতে শিখেছে কারণ তারা দেখেছে তাদের চারপাশের যেকোনো বয়সের মানুষই মৃত্যুবরণ করছে। আজকাল বয়স্ক এবং শিশুরা সবাই ই এই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসেছে কারণ জনস্বাস্থ্যের নাটকীয় সাফল্য এখন বাড়িয়ে দিচ্ছে বেঁচে থাকার আশা। মানব জীবনের ইতিহাস থেকে দেখা যায় বেশিরভাগ মানুষই তার নিজ ঘরে মৃত্যুবরণ করে।

মৃত্যু পরবর্তী ইন্দোবেশিয়ার একটি দুর্লভ আচারানুষ্ঠান ; Image source : Reddit

পাশ্চাত্যের অনেক জায়গাতেই দেখা যেত মৃত ব্যক্তিকে অন্যরকম সম্মাননা প্রদান করা একটি সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যৌথ পরিবার এবং সম্প্রদায় সেখানে হাজির হত দেখার জন্য, আত্মীয়দেরকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য, ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপ, বিদায় সংবর্ধনা এবং আশীর্বাদ করার জন্য। এটি ছিল মৃত ব্যক্তি এবং সমাজে তার অবস্থানের জন্য চূড়ান্ত সমর্থন।

নানান চিত্রকর্মের মাধ্যমেও এই মুহূর্তগুলো তুলে ধরা হয়েছে। দেখতে চাইলে আপনারা Louis XIV-এর কাজগুলোতে খানিক চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন। শুধু মৃত্যু নয় তার পাশাপাশি মৃত্যুতে রূপান্তরিত হওয়াকে গোলমেলে ও উগ্রভাবে উপস্থাপনের অসংখ্য উদাহরণও আছে এইসব চিত্রকর্মে। অন্যতম উদাহরণ “Danse Macabre”। এই মোটিফটি মধ্যযুগীয় ভুতুড়ে বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করে। মড়া কিংবা কংকালের উত্তেজিত নাচের মাধ্যমে অমনোযোগী সব মানুষকে টেনে বা হেঁচড়ে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়।

Danse Macabre-এর একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ; Image source : Atlas obscura

চতুর্দশ শতকের দিকে যখন জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ মৃত্যুবরণ করতে লাগলো যেন স্বর্গ থেকে কোনো আদেশ দেওয়া হয়েছে পৃথিবীর মানুষ আর প্রকৃতির মধ্যে সংঘর্ষ জুড়ে দিতে, তখন মানুষ মৃত্যুর যে উদীয়মান দেখলো তা ছিল পাশব যন্ত্রণায় মানুষ পঁচে গিয়ে প্রকৃতিতে মিশে যাওয়া।


তখন Art of Dying নামে সৃষ্টি হলো একেবারেই নতুন এক সাহিত্য যেটি ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। ব্রিগুয়েলের চিত্রকর্মে আমরা সেই প্রমাণ পাই যেখানে ফুটে উঠেছে মানুষের মৃত্যু, প্রকৃতির দুর্নীতি ও জীবের পচন।

মৃত্যুর প্রক্রিয়া :

যারা অবিচলিতভাবে অনিয়ন্ত্রিত কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন না তাদের জন্য মৃত্যু মূলত জীবনের সবচেয়ে শান্তিদায়ক কিছু হয়ে আসে। আমরা যদিও জানি না মৃত্যুর সময় মষ্তিষ্ক কিভাবে তার ক্রিয়াকলাপ পরিবর্তন করে ফেলে তবে এটা জানি যে এটি তখন এন্ডরফিন্স নির্গত করে, অক্সিজেনের ঘাটতি শুরু হয়, সংবেদনশীলতা এবং ডান হেমিস্ফিয়ারের সক্রিয়তার ক্ষতি হয়।

বাঁচার জন্য যুদ্ধ করলেও মৃত্যু হচ্ছে অবধারিত ; image source : New York post

মানুষ এভাবেই মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়, নিশ্চিন্ত অনুভব করে, অমনোযোগী হয়ে যায় এবং ঝিমুনির অনুভূতি হয়। তারা ঘুমিয়ে পড়ে এবং কোমা ও প্যারালাইসিসের সাথে সখ্যতা করে একটি হিপনোটিক পর্যায়ে চলে যায়। শ্বাস-প্রশ্বাস ধীরগতির হয়ে আসে এবং এক পর্যায়ে থেমে যায় হৃৎপিণ্ড এবং বিপাক প্রক্রিয়া থেমে যায়। সবশেষে, রক্ত জমাট বাঁধে।

অনেক চিকিৎসকই মৃত্যুর সময় কিছু মানুষের নির্লিপ্ত প্রশান্তি লক্ষ করেছেন। ষোড়শ শতাব্দীর দার্শনিক মন্টেগনি লিখেছিলেন, ‘কিভাবে মরতে হয় তা যদি তুমি না জানো তাহলে নিজেকে বিপদে ফেল না; প্রকৃতিই তোমাকে পরিপূর্ণ এবং পর্যাপ্তভাবে নির্দেশনা দিবে; সে এমন আচরণ করবে যেন এটা তোমার কোনো কাজ নয়, তাতে তোমার হস্তক্ষেপ করার কিছু নেই।’

মাঝেমধ্যে মৃত্যুতে থাকে আনন্দও। রোমিও এন্ড জুলিয়েটে শেক্সপিয়ার লিখেছিলেন, ‘কিভাবে মানুষ যখন ক্ষণেক্ষণে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে চলে আসে তারা উল্লাস করতে পারে!’ বিজ্ঞানী টমাস এডিসনের শেষ কথা ছিল, ‘উপরের দিকে এটা বেশিই সৌন্দর্যময়’ দার্শনিক উইলিয়াম জেমস বলেছিলেন, ‘একটা বাড়ি (পরকালে) পাওয়াই অধিকতর শ্রেয়’