সম্ভবত আপনি আপনার দাদী-দাদী কিংবা বয়স্ক কোনো আত্মীয় থেকে এমন কোনো গল্প শুনেছেন যেটি শুরু হয়, ‘আমাদের সময়ে….’ এমন নামে। তখন কিভাবে তারা ৫ মাইল দূরত্ব পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যেতেন, কি পাহাড়ে হেঁটে! ঝড় বৃষ্টি এড়িয়ে! কিংবা হিংস্র জন্তুদের সাথে কেমন বীর সাহসীর মতো যুদ্ধ করতেন বাদ যায়নি হয়তো সে গল্পও।

তখন তারা যে খাদ্য খেতেন তা ছিলো ভারী এবং সুসিক্ত প্রাণীজ চর্বি দিয়ে পরিপূর্ণ যা এখন আমাদের মাংসপ্রেমীরাও খেতে ইতস্তত করবেন, যেমন একটি থালা ভর্তি সেদ্ধ ভেড়ার মাংস। তাছাড়া তখনকার এই ঘটনাগুলো শুনতেও আমাদের কাছে এখন অত্যুক্তি লাগে। গত অর্ধ শতাব্দীতে আমাদের খাদ্যতালিকা পাল্টে গেছে ভীষণভাবে। এখন আমরা যে খাবারগুলো খাই বা যেমন করে খাই তখন তা ছিলো সম্পূর্ণ বা অনেকাংশে আলাদা।

আমাদের দাদা-দাদীরা ছিলেন অধিকতর কর্মঠ; Image source: psychological today

কী ঘটেছে আসলে? কিভাবে পরিবর্তন হলো আমাদের খাদ্য বা পুষ্টি?

মাংস, ডিম এবং দুগ্ধজাত খাদ্য

ফ্যাক্টরিতে উৎপাদিত প্রাণীজ পণ্য, যার উপর ভিত্তি করে এখন অভাবনীয় হারে ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠছে আজ থেকে ১০০ বছর পূর্বে তা কল্পনা করাও ছিলো অসম্ভব। যদি আপনি গ্রাম্য এলাকায় বাস না করে থাকেন যেখানে নিজেই গৃহপালিত পশুপাখি পালন করতে পারতেন তাহলে আপনার ঘরের দরজায় নিশ্চয়ই একজন গোয়ালা আসে যে আপনাকে প্রতিদিন দুগ্ধজাত পণ্যের যোগান দেয়।

দুগ্ধজাত পণ্য; Image source: medical news today

মাংস, পোল্ট্রি এগুলোও পেয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় কোনো কসাই যে কিনা এগুলো নিজের কাছেই রাখে তার কাছ থেকে। কিন্তু গ্রোথ হরমোন, এন্টিবায়োটিক এবং জেনেটিক্যালি মোডিফাইড খাবারগুলো একসময় প্রাণীদেরকে খাওয়ানো হতো না।

আজ হয়তো আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে খাবার পাচ্ছি কিন্তু তারা খেতে পারতো স্বাস্থ্যকর খাবার, খেতো সুস্থ প্রাণী যেগুলো নিজেরা ঘুরেফিরে ঘাস খেতো, আশাজনকভাবে মানুষের সত্যিকার ভালোবাসা পেয়ে বেড়ে উঠতো।

বর্তমানে অবশ্য এটা কোনো ব্যাপার না। যেখানে শুধুমাত্র আমেরিকান ফ্যাক্টরিগুলোতেই ১০ বিলিয়নেরও বেশি প্রাণী (মাছের হিসাব অগুণতি) বেড়ে উঠছে। তাদের বেশিরভাগই দিনের আলোটা কেমন তাও দেখতে জানে না, যেন শুধুমাত্র তাদেরকে বধ করার মাধ্যমেই মুক্তি দেওয়া হয়। তারা বাস করবে অন্ধকার, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে যেখানে সহজেই রোগ ছড়িয়ে যায়।

এখনকার ফ্যাক্টরি ফার্মিং; Image source: gatkro.blogspot

তারা খাবে কৃত্তিম খাদ্য যেগুলো কেমিক্যাল আর ড্রাগে ভর্তি। এগুলোই প্রভাব ফেলে প্রাণীগুলোর শরীরে এবং সর্বশেষে ভোজনের মাধ্যমে আমাদের, মানবজাতির উপর। যখন আমরা সুস্বাদু খাবার হিসেবে এই মাছ মাংস বা মিষ্টি দুধ খেয়ে থাকি, এগুলো যে ধরণের ঔষধ শোষণ করেছে তা আমাদের শরীরে পৌঁছে কোষের ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়। আমাদের সামর্থ্য নষ্ট করে দেয়।

তাই চেষ্টা করুন আপনার দাদা-দাদী যেমনটি খেয়েছিলো অর্থাৎ জৈব, ঘাস খাওয়া প্রাণী, তাদের ডিম বা দুধ খেতে। বেশি ভালো হয় আপনি নিজে যদি এগুলো স্থানীয় কোনো উৎস থেকে খুঁজে নেন।

ফল এবং শাকসবজি

পঞ্চাশ বছর আগে ফল এবং শাকসবজি যে পরিমাণ ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থ ধারণ করতো তা এখন আর নেই, কমে গেছে অনেকাংশেই। তার জন্য আপনি দায়ী করতে পারেন কীটনাশক এবং রাসায়নিক সারকে যেগুলো মাটির গুণগত মান নষ্ট করছে, হ্রাস করছে তার গুরুত্বপূর্ণ পরিপোষক পদার্থকে।

আগেকার চিত্র, তৃণভূমিতে ছিলো বিচরণ; Image source: Civil eats

আবার ফ্যাক্টরি ফার্মগুলোর দিকে তাকালে দেখতে পাবেন কিভাবে এদের বর্জ্য পদার্থ মাটি আর পানিকে দূষণ করছে যার ফলে বিভিন্ন ধরণের রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে এবং তার ফলাফল হচ্ছে প্রকট। এমনকি জৈব যৌগগুলোও মাটির সাথে নিত্যদিনই লড়াই করে যাচ্ছে যার ফলে তা আর ৫০ বছর আগেকার মাটির মতো নেই, হয়ে গেছে অনেকটাই পরিবর্তিত। এটি একটি কঠিন যুদ্ধ কিন্তু হারাতে পারছে না কেউ কাউকেই।

একজন কৃষক যিনি বায়োনিউট্রিয়েন্ট ফুড এসোসিয়েশন ডিরেক্টরও, ড্যান কিট্রেজ আশা করেন কৃষিকাজের এই খারাপ মানদণ্ডগুলোকে পরিবর্তন করা সম্ভব, আরো উচ্চতর উৎপাদনের বিষয়বস্তু দিয়ে। তিনি কৃষকদের সাথে মাঠে কাজ করছেন সরাসরি। তাদেরকে সাহায্য করছেন ক্ষয়ে যাওয়া মাটির সাথে যুদ্ধ করে উন্নত দ্রব্য এবং আস্বাদন উৎপাদন করতে।

হাইব্রিড ফলমূল আকারে হয়েছে বড় কিন্তু হারিয়েছে পুষ্টিগুণ; Image source: zwemza

আমাদের দাদা দাদী বা প্রপিতামহরা যখন বেড়ে উঠেছিলেন তখন জৈব কৃষিকাজ ছিলো অপরিহার্যভাবে মানসম্মত। তাই তারা ছিলেন আমাদের চেয়ে শক্তিশালী এবং কর্মঠ। আমরাও নিশ্চয়ই চাইবো আমাদের নাতী-নাতনী বা তাদের নাতীনাতকুর ও বেড়ে উঠুক সুস্থ সবলভাবে। তাই এখনই আমাদের উচিত জৈব কৃষক, স্থানীয় কৃষক এবং তাদের উৎপাদনের সুবিধায় জোরালোভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা।

প্রক্রিয়াজাত খাদ্য

আমি অনেক চলচ্চিত্র দেখেছি, বিশেষত ৭০/৮০ বছর আগের ছবি (আচ্ছা আপনি দেখেছেন? দ্যা থিন ম্যান সিরিজকে এই পর্যন্ত কোনো মুভি টপকে যেতে পেরেছে?)। আর যেহেতু আমি ফুড রাইটার তাই প্রায়ই খেয়াল করতাম অভিনেতারা কী খাচ্ছেন। খাবার ছিলো একটা বড় উপজীব্য স্বরুপ এবং অনেক অভিনেতাই তার উপর নির্ভর করতেন (ব্র‍্যাড পিটের যেকোনো মুভি দেখলেই বুঝবেন)।

পুরনো চলচ্চিত্রে খাওয়ার দৃশ্য ছিলো অহরহ; Image source: popsugar

খাবার ছিলো তখনকার সংস্কৃতির একটা স্তম্ভ, পুরনো ছবিগুলো দেখলেই তা বুঝা যায়। অথচ আপনি কিন্তু কোনো জাংক ফুড দেখতে পাবেন না সেখানে! সময় পাল্টাতে শুরু করেছে ১৯৫০ এর পর থেকে যখন মানুষের মগজে বুদ্ধি এলো শর্টকাট উপায়ে দ্রুত খাদ্য উৎপাদন করার। বর্তমানে, আমাদের যেকোনো প্রক্রিয়াজাত খাদ্যগুলো তাদের আসল রূপের মতো দেখায়।

আমেরিকার প্রায় ৮০% প্রক্রিয়াজাত খাদ্যই জেনেটিক্যালি মোডিফাইড উপাদানে ভর্তি। সেগুলো রঙ, গন্ধ এবং মিষ্টি দিয়ে তৈরি যা সবই কৃত্রিম। তাদেরকে দীর্ঘদিনের জন্য সুস্থিত করা হয় ট্রান্স ফ্যাট এবং কেমিক্যাল প্রিজারভেটিভ দিয়ে এবং সবশেষে প্যাকেটজাত করা হয় প্লাস্টিক দিয়ে যা কিনা ক্যান্সার এবং জন্মত্রুটি তৈরিতে দক্ষ।

ফুড এক্সপার্ট মাইকেল পোলান তার বই ‘ফুড রুলস’ এ লিখেছেন আমাদের তেমন জাংক ফুডই খাওয়া উচিত যেমন আমরা নিজেদেরকে বানাতে চাই। আপনি যদি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে পারেন যে প্রক্রিয়াজাত/ফাস্ট/জাংক ফুড আপনি বর্জন করতে পারবেন (কোনো অনুষ্ঠানে ব্যতীত) তাহলেই একটি সুস্থ জীবন যাপন করতে পারবেন আপনি।

Feature Image: hausa.naijanews