গ্যাস্ট্রিক কম বেশি সকলের খুব পরিচিত একটি সমস্যা। প্রতি ১০ জন ব্যক্তির মধ্যে ৮ জনেরই গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দেখা যায়। দীর্ঘ সময় ধরে খালি পেটে থাকা, অতিরিক্ত মশলাযুক্ত খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত ভাজা-পোড়া খাবার খাওয়া, ধূমপান, খাবারে অনিয়ম, অতিরিক্ত চা বা কফি পান করা, রাত জাগা, পরিমাণমতো পানি পান না করা ইত্যাদি কারণে মূলত গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দেখা দেয়।

গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় দেখা দেয় পেট ব্যথা; Image Source: cancerliving.today

গ্যাস্ট্রিকের লক্ষণ

গ্যাস্ট্রিকের লক্ষণগুলো হলো পেটে জ্বালা পোড়া করা, বদহজম, বমি বমি ভাব, বমি করা, ঢেকুর ওঠা, পেট ফুলে যাওয়া, ক্ষুধা হ্রাস পাওয়া, মুখের মধ্যে টক ভাব ইত্যাদি। গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থেকে রক্ষা পেতে অনেকেই অনেক উপায় অবলম্বন করেন। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, সবার বাসায় আজকাল এক পাতা এন্টাসিড ট্যাবলেট থাকেই। গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা নিয়ন্ত্রনে না রাখলে পরবর্তিতে সম্মুখীন হতে হয় আলসার অথবা ক্যান্সারের মতো নানা সমস্যার। তবে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা খুব সহজেই নিম্ন লিখিত ভেষজ উপায়গুলোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

১. তুলসী পাতা

গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে তুলসী পাতা অত্যন্ত কার্যকর একটি উপায়। তুলসী পাতার রস পেটের গ্যাস পরিষ্কার করতে খুবই উপযোগী। এক কাপ পানিতে ৩-৪ টি তুলসী পাতা দিয়ে দুই থেকে তিন মিনিট জাল দিয়ে খেলে পাকস্থলীর গ্যাস্ট্রিক অ্যাসিড স্থিতিশীল হয়ে আসে।

তুলসী পাতা; Image Source: cookingwithawallflower.com

২. মৌরি বীজ

তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা থেকে পরিত্রাণ পেতে মৌরির বীজ অত্যন্ত কার্যকরী। এটি এসিড কমিয়ে, পেটের জ্বালা, বুকে ব্যথা, মুখের মধ্যে টক ভাব দূর করে। পেট ফাঁপা চিকিৎসায় মৌরি বীজের চায়ের জুরি নেই।

মৌরি বীজ; Image Source: .frontiercoop.com

৩. দারুচিনি

বিভিন্ন ধরনের হজমজনিত সমস্যায় দারুচিনি এক নম্বর ঔষধ। দারুচিনিতে রয়েছে অ্যাান্টি এন্টাসিড, যা প্রাকৃতিকভাবেই এটি অম্লনাশক হিসেবে কাজ করে এবং পাকস্থলীর গ্যাস কমিয়ে আনতে বেশ সাহায্য করে। ভালো ফলাফল পাওয়ার জন্য গরম পানি অথবা দুধের সাথে দারুচিনির গুঁড়ো সেদ্ধ করে খাওয়া হয়।

দারুচিনি; Image Source; bdlatest24.com

৪. অ্যালোভেরা

অ্যালোভেরায় উপস্থিত নানাবিধ খনিজ পদার্থ হজম ক্ষমতার উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। অ্যালোভেরায় উপস্থিত এসিড, পাকস্থলীতে তৈরি হওয়া অ্যাসিডের কর্যকারিতা কমিয়ে দেয়। যার ফলে অ্যাসিডিটির সমস্যা একেবারে নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

অ্যালোভেরা; Image Source: americanschoolofnaturalhealth

৫. রসুন

রসুন অন্ত্রের রস নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে। রসুনের সাথে গোল মরিচ গুঁড়ো, ধনে ও জিরে গুঁড়ো একসাথে মিশিয়ে পানিতে ফুটিয়ে, সেদ্ধ করে তা ছেঁকে আলাদা করে, ঠাণ্ডা করার পর সাধারণ তাপমাত্রায় এনে এক চামচ মধু দিয়ে দিনে দু’বার পান করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

রসুন; Image Source: .naturalfoodseries.com

৬. কলা

প্রতিদিন একটি করে কলা খাওয়া শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। কলাতে থাকে অ্যান্টি অ্যাসিড যা অ্যাসিডিটি কমাতে অনেক উপযোগী।

কলা; Image Source: milkandeggs.com

৭. আদা

খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বুক জ্বালা নিয়ন্ত্রণ এবং বদ হজমের সমস্যা নিরাময় করতে আদা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিন খাওয়ার আগে বা পরে এক টুকরা আদা চিবিয়ে খেলে বেশ ভালো ফল পাওয়া যায়। সকালবেলা গরম পানিতে আদা সেদ্ধ করে খাওয়া শরীরের জন্যে বেশ উপকারী। এতে গ্যাসের সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার সাথে সাথে শরীরের অতিরিক্ত ওজনও কমে যায়।

আদা; Image Source: foodrevolution.org

৮. গোল মরিচের গুঁড়ো

গোল মরিচের গুঁড়ো শরীরে অ্যাসিডিটি এবং বদহজম কমাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। এটি পাকস্থলীর এসিডিটি কমাতে সাহায্য করে। তালের বা আখের গুড়ের সাথে গোল মরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে খেলে বেশ ভালো ফল পাওয়া যায়।

গোল মরিচ; Image Source: spicejungle.com

৯. ঠান্ডা দুধ

দুধের প্রধান উপাদান হলো ক্যালসিয়াম, যা পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাাসিড তৈরীর প্রক্রিয়াকে বাধা দান করে।

দুধ; Image Source: goodfood.com.au

১০. কালো জিরা

কালো জিরার অনেক ঔষধি গুণ রয়েছে। চায়ে কালো জিরা মিশিয়ে খেলে বেশ উপকার হয়। এক কাপ কালো জিরার চা হজমে বেশ সাহায্য করে।

কালো জিরা; Image Source: sansaranepal.com

১১. ঘোল বা মাঠা

অ্যাসিডিটি কমাতে ঘোল বা মাঠা অত্যন্ত উপযোগী। কারণ ঘোল বা মাঠা তৈরির প্রধাণ উপাদান হলো টক দই। টক দইয়ে লেবুর রস, পুদিনা পাতার রস, আদার রস, সামান্য লবণ এবং প্রয়োজনমতো চিনি মিশিয়ে ঘোল বানাতে হয়। খাওয়ার পর এক গ্লাস মাঠা শরীরের সকল ক্লান্তি দূর করে হজমে বেশ সাহায্য করে।

মাঠা; Image Source: archanaskitchen.com

১২. লবঙ্গ

লবঙ্গ বমির ভাব কমাতে বেশ সাহায্য করে। লবঙ্গের রস খুব সহজেই অ্যাসিডিটি কমিয়ে আনতে পারে।

লবঙ্গ ; Image Source: longevitylive.com

১৩. অ্যাপেল সাইডার ভিনেগার

পাকস্থলীতে আ্যসিড তৈরী হওয়ার প্রক্রিয়াকে রোধ করতে রোজ দুইবার এক গ্লাস পানিতে দু চা চামচ অ্যাপেল সাইডার ভিনেগার গুলিয়ে খেতে হবে।

অ্যাপেল সাইডার ভিনেগার ; Image Source: longevitylive.com

১৪. আমলকি

আমলকি শরীরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ফল। আমলকিতে থাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, যা অ্যাসিডিটি এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে বেশ সহায়তা করে।

আমলকি; Image Source: apnlive.com

১৫. আলুর রস

তীব্র গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা দূর করতে আলুর রস অনেক উপকারী। দিনে নিয়ম করে তিনবার আলুর রস খেলে পেট পরিষ্কার থাকে।

আলু; Image Source: crocus.co.uk

১৬. ডাবের পানি

ডাবের পানি পাকস্থলির পিএইচ লেভেল ঠিক রাখে। যার ফলে পাকস্থলিতে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া বংশবিস্তার করতে পারে না।

ডাবের পানি; image source: goodfood.com.au

১৭. পুদিনা পাতা

পুদিনা পাতার রস পাকস্থলীর গ্যাস ও বমিভাব কমাতে বেশ কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। গ্যাসের ব্যথা শুরু হওয়ার সাথে সাথে কিছু পুদিনা পাতা মুখে নিয়ে হালকা চিবিয়ে নিলে ভালো ফল হবে। এছাড়াও গরম পানিতে পুদিনা পাতার চা তৈরি করে তার সাথে মধু মিশিয়ে খেলেও তা শরীরের জন্যে বেশ উপকারী।

এই সকল ভেষজ উপায় মেনে চলার সাথে সাথে, মেনে চলতে হবে আরো কিছু নিয়ম এবং অস্বাভাবিক জীবনযাত্রায় আনতে হবে কিছু পরিবর্তন।

খাওয়ার অভ্যাসের পরিবর্তন

সঠিক সময়ে খাওয়া দাওয়া করলে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা যায়। যেমন অধিক সময় খালি পেটে না থাকা, প্রতিদিন সকাল, দুপুর এবং রাতের খাবার একটি নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া, অতিরিক্ত তেল জাতীয় খাবার পরিহার করা, ফাস্টফুড, মশলাদার খাবার ইত্যাদি ত্যাগ করা। প্রতিদিন খাবারের তালিকায় সুষম খাদ্যের ভারসাম্য মেনে চলা এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা।

সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন, সুস্থ থাকুন; image source:healthyshetland

ধূমপান ত্যাগ করা

গ্যাসের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে হলে ধূমপানের অভ্যাস অবশ্যই ত্যাগ করতে হবে। আর ধুমপান থেকে মুক্তি পাবার সহজ কিছু টিপস পড়ুন এখানে

ধূমপান ত্যাগ করতে হবে; image source: healthyshetland

পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা

ঘুমের সাথে আমাদের পুরো শরীরের রক্ত চলাচল সরাসরিভাবে সংযুক্ত। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে, অতিরিক্ত চিন্তা করলে অথবা খুব বেশি উত্তেজিত হয়ে থাকলে হজমের ক্ষেত্রে বেশ অসুবিধা হয়। তাই খেয়াল রাখতে হবে যেন পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম নিশ্চিত করা যায়।

পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে;image source:unitec.ac.nz

ব্যায়াম করা

আজকাল বেশিরভাগ স্বাস্থ্যজনিত সমস্যাগুলোর কারণ হচ্ছে নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব। বিশেষ করে চাকুরিজীবীদের ব্যায়াম করাটা আজকের দিনে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তবে প্রতিদিন সকালে ২০-৩০ মিনিট ব্যায়াম করলে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যাসহ দূরে থাকা যাবে উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়েবেটিসের মতো মারাত্নক রোগবালাইয়ের হাত থেকে।

তাই গ্রহণ করুন প্রাকৃতিক ও সুষম খাদ্য, থাকুন সুস্থ সবল আর হাসি খুশি।