বর্তমানে, আমরা এমন এক বিশ্বে বাস করছি যেখানে নানান ধরণের ঔষধ এবং প্রেসক্রিপশনের ছড়াছড়ি। তবে আরোগ্যলাভের জন্য এটি ছাড়া আর কি কোনো উপায় নেই?

এই বিশ্বায়নের যুগেও অনেক মানুষ এখনো ফিরে যাচ্ছে ঔষধি গাছের কাছে যাদের আছে চমৎকার ঔষধি গুণ। সেগুলো শারিরীক কিংবা মানসিক নানান ব্যাধির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে সক্ষম।

প্রকৃতপক্ষে একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকেই WHO (World Health Organization) এর মতে ২৫২টি ঔষধের ১১% ঔষধকেই বিবেচনা করা হয়েছে ‘ব্যাসিক এন্ড এসেনশাল’ হিসেবে যারা মূলত ছিলো সপুষ্পক উদ্ভিদ প্রজাতি। যেমন কোডেইন, কুইনিন এবং মরফিন এই সবই হচ্ছে উদ্ভিদ ধারণকৃত উপাদান।

এখানে পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী তেমন ৫ টি ঔষধি গুণসম্পন্ন উদ্ভিদ সম্পর্কেই জানবো।

১) জিংকো

জিংকো বিলোবা; Image source: amazon.com

রেটিং

নিশ্চয়তা: ৩/৫
প্রমাণ: ৩.৫/৫

উদ্ভিদের অন্যতম পুরনো প্রজাতির মধ্যে একটি হচ্ছে জিংকো যেটি হোমিওপ্যাথিক উদ্ভিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে প্রাচীনকাল থেকে। এটি চাইনিজ মেডিসিনেরও প্রধান ঔষধি। ক্যাপসুল, ট্যাবলেট এবং নির্যাস তৈরিতে এর পাতা ব্যবহৃত হয়। আর শুকনো পাতা খাওয়া হয় চা হিসেবে।

এই পর্যন্ত জানামতে মষ্তিষ্কের সুস্থতায় এটির ক্ষমতা অতুলনীয়। গবেষণা বলছে যে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় এটি ভূমিকা রাখে। ডিমেনশিয়া এবং আলজেইমার রোগের মহাষৌধ এটি।

আরো একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা গেছে ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় এটিও একটি উপাদান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম। তাছাড়াও হাড়ের ক্ষয় পূরণে ভূমিকা রাখে এই জিংকো।

আকর্ষণীয় তথ্য : জিংকো গাছকে বিবেচনা করা হয় একটি জীবন্ত জীবাশ্ম হিসেবে যেটি প্রায় ২৭০ মিলিয়ন বছর পূর্ব থেকে বাস করে আসছে পৃথিবীতে। এই গাছগুলো বেঁচে থাকতে পারে প্রায় ৩,০০০ বছর!

২) হলুদ

হলুদ এবং হলুদ গুড়া; Image source: parenting.firstcry

রেটিং

নিশ্চয়তা: ঔষধ হিসেবে ৫/৫,
সম্পূরক বস্তু হিসেবে ৪/৫
প্রমাণ: ৩/৫

চকচকে একটি কমলা রঙের অধিকারী এই হলুদ। রান্নাঘরে এক বোতল ভর্তি হলুদের অস্তিত্ব ছাড়া মশলার তাক কল্পনাই করা যায় না! বিশ্বাস করা হয় এন্টি-ক্যান্সারের অসাধারণ গুণসম্পন্ন এই হলুদের উদ্ভব ভারতে। ডিএনএ মিউটেশনেও বাধাদান করে এটি।

এন্টি-ইনফ্ল্যামেটরি (প্রদাহ হীন) গুণের কারণে সাপ্লিমেন্টে এটি ব্যবহার করা হয়। মলম হিসেবে ব্যবহৃত হয় বাতে আক্রান্ত রোগীর অস্বস্তি নিরাময়ে। সারাবিশ্বেই এটি ব্যবহৃত হয় রসনার উপাদান হিসেবে যা খাদ্যকে করে তুলে সুস্বাদু। সাথে পালন করে এন্টি-অক্সিডেন্টের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

সাম্প্রতিক গবেষণা অনুসারে বিভিন্ন ত্বকীয় রোগের চিকিৎসায় এটি অসাধারণ কার্যক্ষমতা দেখিয়েছে সাথে বাতের ব্যথাতেও।

আকর্ষণীয় তথ্য: প্রায় ৪,০০০ বছর আগে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ঔষধ হিসেবে হলুদ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ভারতে বহুল ব্যবহৃত আয়ুর্বেদিকের চর্চায় হলুদ হচ্ছে অন্যতম প্রধান উপাদান।

৩) ইভনিং প্রিমরোজ অয়েল

ইভনিং প্রিমরোজ ফুল এবং তেল; Image source: 123rf.com

রেটিং


নিশ্চয়তা:
মলম হিসেবে ৪.৫/৫, ওরালি (মুখের মাধ্যমে) ৩/৫

প্রমাণ: ৩/৫

স্পন্দনশীল হলুদ ইভনিং প্রিমরোজ ফুলটি থেকে এক প্রকার তেল উৎপাদিত হয় যা প্রি-মেন্সট্রুয়াল সিনড্রোম এবং একজেমার মতো চর্মরোগ উপশমে ব্যবহৃত হয়। কিছু গবেষণা অনুসারে ইভনিং প্রিমরোজ তেলে এন্টি ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য আছে। যেটি নানা ধরণের চর্মরোগ এবং ডায়বেটিক নিউরোপ্যাথির অবস্থা সম্পর্কে জানান দেয় এবং নিরাময় করতে সক্ষম।

সাম্প্রতিক গবেষণায় আরো বলা হচ্ছে জটিল স্ক্লেরোসিস আক্রান্ত রোগীর অবস্থা উন্নতির জন্য, হরমোনের পরিবর্তন এবং পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোনের সাথে ইনসুলিনের সংবেদনশীলতা নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এটি। সাথে মিল্ড ডার্মাটিটিসের চিকিৎসায় মলম হিসেবে তো ব্যবহৃত হচ্ছেই।

আকর্ষণীয় তথ্য: এই ফুলকে মুন ফ্লাওয়ার নামেও ডাকা হয় কারণ সূর্য যখন অস্ত যাওয়া শুরু করে এরাও ফুটতে থাকে পাল্লা দিয়ে। মানুষজনের মতে এই ফুলের গন্ধ লেবুর মতো।

৪) ফ্লাক্স সিড

ফ্লাক্স সিড; Image source: paisawapas

রেটিং


নিশ্চয়তা: ৪.৫/৫
প্রমাণ: ৩.৫/৫

ফ্লাক্স সিড তেল রূপে সহজলভ্য। উদ্ভিজ্জ সাপ্লিমেন্টের খাদ্যতালিকার অন্যতম নিরাপদ উপাদান এটি। সহস্র বছর থেকে আজ পর্যন্ত চাষ করে আসা এই ফ্লাক্স সিডের আছে অসাধারণ এন্টি অক্সিডেন্ট কার্যক্ষমতা এবং এন্টি ইনফ্ল্যামেটরি গুণাগুণ।

হিউম্যান সাব্জেক্টের একটি রিসার্চে বলা হচ্ছে কোলন বা মলদ্বারের ক্যান্সার প্রতিরোধেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্য একটি গবেষণা অনুসারে ব্লাড প্রেসার কমানোর ক্ষমতা আছে ফ্লাক্স সিডের। নিয়মিত এটি খাওয়া হলে কমবে অতিরিক্ত ওজন। অনেক মানুষই ওটমিল বা স্মুথি খাওয়ার সময় সাথে ফ্লাক্স সিড যোগ করেন।

ট্যাবলেট, তেল (ক্যাপসুলের ভেতরে ব্যবহার করা হয়) এবং ময়দার মতো গুড়া রূপেও পাওয়া যায় এটি।
তবে ফ্লাক্স সিডের সবচেয়ে ভালো ব্যবহার হচ্ছে আপনার খাবারের সাথে এটি যোগ করা। শাক, সালাদ, ঘরে তৈরি ব্রেড কিংবা স্মুথির সাথে এটি খেতে পারবেন আপনি।

আকর্ষণীয় তথ্য: এক থাবা ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড পেতে চাইলে আপনার ফ্লাক্স সিডই যথেষ্ট। এই ফ্যাটি এসিডের অন্যান্য উৎস হলো সিয়া সিড, আখরোট এবং সয়াবিন।

৫) টি ট্রি অয়েল

টি ট্রি; Image source: Indiamart

রেটিং

নিশ্চয়তা: ৪/৫
প্রমাণ: ৩/৫

টি ট্রির আদি জন্মস্থান অস্ট্রেলিয়াতে। এটি থেকে যে তেল উৎপাদিত হয় তা ত্বকের জন্য উপকারী। ব্রণ, মেছতা, ছোটখাটো ব্যথা, খুশকি, পোকার কামড় এবং ত্বকের অন্যান্য প্রদাহ থেকে নিরাময় লাভ করা যায় এটি দিয়ে। অবশ্য ব্রণ এবং স্কাল্পে এই অয়েল ব্যবহার করার উপায় নিয়ে আরো বেশি গবেষণা প্রয়োজন।

ইতোমধ্যে রিসার্চে এটিও পাওয়া গিয়েছে যে টি ট্রি অয়েল এন্টি মাইক্রোবিয়ালের সুপার পাওয়ার ধারণ করে এবং বিভিন্ন ত্বকীয় সংক্রমণের জন্য এটি বেশ উপকারী। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুসারে ব্রণ তৈরিতে যে অনুজীবগুলো দায়ী টি ট্রি অয়েল তাদের বৃদ্ধি ধীরগতির করে দেয়। এটি মূলত বেশি ঘনত্বের একটি এসেনশাল অয়েল।

উইলসন বলেছেন শুধু টি ট্রি নয়, অন্য সব এসেনশাল অয়েলও পাতলা করে ব্যবহার করা উচিত। কম ঘনত্বের তেল দিয়ে ত্বকের যত্নে ব্যবহৃত নানা ধরণের পণ্য এবং ক্রিম তৈরি করা হয়।

আকর্ষণীয় তথ্য: টি ট্রি অয়েল হচ্ছে একটি গাছের পাতা থেকে উৎপাদিত একটি তেল যার আদি জন্মস্থান অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড এবং নিউ সাউথ ওয়ালেসে।

Feature Image: zululand.observer