মাথাব্যথা কী?

মাথা কিংবা ঘাড়ের কাছের অংশে যে ব্যথা অনুভূত হয় তা মাথাব্যথা। বাচ্চাদের মধ্যেও মাথাব্যথা দেখা যায় বেশি হারে, যা অনেক ধরণের কারণেই হয়ে থাকে এবং এর প্রবলতাও বেশি। তাই কখন তাদের মাথাব্যথা শুরু হচ্ছে এবং কোন সময়টায় বৃদ্ধি পাচ্ছে তার তীব্রতা তা জানা উচিত। সেইসাথে মাথাব্যথা কমানোর প্রক্রিয়াও।

মাথাব্যথার উপসর্গ এবং লক্ষণগুলো কী?  

বাচ্চাদের মাথাব্যথা মূলত দুই কারণে হয়। যখন তারা চিন্তিত হয় বা মাইগ্রেনের কারণে। চিন্তার কারণে মাথাব্যথা হলে মাথা বা ঘাড়ের মাংসপেশিতে প্রচণ্ড চাপ পড়ে থাকে। ব্যথাগুলো এমন হয় যেন:

  • মাথার সামনে, পেছনে কিংবা দুইদিকেই কেউ জোড়ে চাপ দিয়ে আছে।
  • ঘোলা বা নিস্তেজ লাগে
  • মাথা ধরে থাকে
  • একটানা ব্যথা হয়ে থাকে

মাইগ্রেন থেকে মাথাব্যথা তুলনামূলক কম দেখা যায়।
এটার ব্যথা থেকে মনে হয়:

  • মাথার এক বা দুই পাশে নিষ্পেষণ হচ্ছে বা ব্যথা কম্পিত হচ্ছে।
  • মাথা ঘোরানো
  • পাকস্থলীতে ব্যথা
  • বমি বমি লাগা বা বমি করা
  • চোখে দাগ বা বলয় দেখা (অরা)

টেনশন এবং মাইগ্রেন মাথাব্যথার আক্রান্ত অংশ; Image source: irishhealth

বেশিরভাগ মাইগ্রেনই ৩০ মিনিট থেকে কয়েক ঘন্টা পর্যন্ত হতে পারে। কারো বা আবার দুইদিনের মতও ব্যথা থেকে যায়। সেই সময়টায় তারা সাধারণত কারো শারীরিক কার্যক্রমে বা আলো, গন্ধ কিংবা উচ্চশব্দের সামনে আসলে অসুস্থ অনুভব করে।

কী কী কারণে মাথাব্যথা হতে পারে?

মূলত শরীরের নার্ভ কিংবা রক্তনালিতে রাসায়নিকের তারতম্য দেখা গেলে মাথাব্যথা হয়। এই তারতম্য মস্তিষ্কে ব্যথার অনুভূতি পাঠায় এবং মাথাব্যথা আকারে ফিরে আসে।

বেশিরভাগ মাথাব্যথা যে কারণে হয়ে থাকে:

  • সংক্রমণ বা ইনফেকশন (কানে ইনফেকশন, ভাইরাসের তৈরি ফ্লু বা সর্দি, গলা ব্যথা, মেনিনজাইটিস কিংবা সাইনাস ইনফেকশন)।
  • মাথায় আঘাত
  • কিছু ঔষধের প্রভাবে
  • অল্প ঘুম বা ঘুমে হঠাৎ ব্যাঘাত
  • পানি স্বল্পতায় ভোগা
  • অতিরিক্ত পীড়ন নেওয়া বা উদ্বিগ্ন হওয়া
  • এলার্জি (হে ফিভার)
  • হরমোন লেভেলের পরিবর্তন বা মেন্সট্রুয়াশন
  • খাবার না খেলে
  • দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটার ব্যবহার বা টিভি দেখা
  • দৃষ্টিজনিত সমস্যা
  • গাড়ি বা বাসে দীর্ঘক্ষণ ভ্রমণ
  • জোরালো শব্দে গান শোনা
  • ধূমপান
  • তীব্র কিছুর গন্ধ (পারফিউম, ধোঁয়া, ধূমপান, নতুন গাড়ি বা কার্পেট) শুঁকলে
  • অতিরিক্ত ক্যাফেইন (এনার্জি ড্রিংক, সোডা, কফি, চা এবং চকলেট)
  • কিছু খাবার যেমন এলকোহল, চিজ, বাদাম, পিজ্জা, চকোলেট, আইসক্রিম, ভাজাপোড়া জিনিস, হট ডগ, ইয়োগার্ট ইত্যাদি খেলেও মাথাব্যথা হতে পারে।

অতিরিক্ত শব্দের কারণে মাথাব্যথা হয় অহরহ; Image source: Youtube

কেমন লক্ষণ দেখে মাথাব্যথা নির্ণয় করা যায়?

আপনার ডাক্তার সাধারণত একটি পরীক্ষা নিবে এবং তার মাধ্যমেই বুঝতে পারবে আপনার বাচ্চার মাথাব্যথার উৎসটা কী? ডাক্তার যা যা জিজ্ঞেস করতে পারে:

  • মাথাব্যথা কতটা প্রকট এবং সাধারণত কোন কোন সময় ব্যথাটা হয়
  • প্রথম কবে মাথাব্যথা শুরু হয়েছিলো
  • ব্যথাটা কেমন অনুভূত হয় এবং কোন কোন জায়গায় আঘাত লাগে
  • কতক্ষণ সময় পরপর ব্যথাটার পরিবর্তন হয়
  • আর কোনো লক্ষণ আছে কিনা
  • সাম্প্রতিক কোনো জখম আছে কিনা
  • এমন কিছু আছে কিনা যা মাথাব্যথাটাকে বাড়িয়ে তোলে

আপনার বাচ্চার খাবারদাবার, অভ্যাস, ঘুমের ধরণ এগুলো দেখেও মাথাব্যথার ধরণ বুঝা সম্ভব কারণ এগুলো এতে প্রভাব রাখে।

  • আপনার বাচ্চা কোনো কিছু নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকলে
  • অতীতের কোনো মেডিক্যাল সমস্যা থাকলে
  • বাচ্চা কোন ওষুধ খাচ্ছে
  • এলার্জি আছে কিনা
  • পারিবারিকভাবে সবার মাথাব্যথা আছে কিনা

কখনো ব্যথা হয়ে উঠে প্রকট; Image source: todaysparent

ডাক্তার একটি নিউরোলজিকাল পরীক্ষাও করবে। তাতে করে তার চোখ দেখা, নার্ভ টেস্ট করা এবং আপনার বাচ্চাকে হাঁটাচলা বা নাকে স্পর্শ করেও দেখাতে হতে পারে। নানান ধরণের মেডিকেল প্রবলেমেএ কারণেই মাথাব্যথা হতে পারে। ডাক্তার আপনাকে বলতে পারে:

  • রক্ত পরীক্ষা করতে
  • CAT স্ক্যান বা মষ্তিষ্কের MRI টেস্ট করানোর জন্য

কিভাবে মাথাব্যথার চিকিৎসা করা হয়?

এটা নির্ভর করবে ডাক্তার কিভাবে কাজটি শেষ করার চিন্তা করছেন। কিন্তু আপনি নিজের বাড়িতে প্রতিদিনই মাথাব্যথা নিরাময়ের জন্য যত্নাদি নিতে পারেন।

ব্যথা কমাতে আপনার বাচ্চাকে:

  • ঠাণ্ডা, অন্ধকার এবং শান্ত একটি রুমে শুইয়ে দিন
  • আর্দ্র নরম একটি কাপড় তার কপাল বা চোখসহ অংশে বিছিয়ে দিন।
  • তাকে বলুন শিথিল হতে, আরাম করতে।
  • ধীরে ধীরে কিন্তু গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিতে বলুন।

ডাক্তারের প্রয়োজনে MRI স্ক্যান করাতে হতে পারে; Image source: kidshealth

আর নিশ্চিত হোন যে আপনার বাচ্চা কিছু খেতে বা পান করতে চাচ্ছে কিনা। যে বাচ্চাদের মাইগ্রেন তারা সাধারণত ঘুমাতে চায় এবং জেগে উঠলে অনেকটা আরামবোধ করে।

আপনি তাকে একটি ব্যথা উপশমক ঔষধ যেমন acetaminophen বা ibuprofen ও দিতে পারে। তবে এটা নিশ্চিত করুন তার বয়স অনুযায়ী ডোজ ঠিক হয় কিনা এবং ঠিক সময় খাচ্ছে কিনা। যদি কোনো প্রশ্ন থাকে তবে অবশ্যই ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে নিবেন।

শিশু বা কিশোর বয়সের সন্তানদের কখনো ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত এসপিরিন খাওয়াবেন না। এসপিরিন
Reye syndrome এর সৃষ্টি করা যা জীবনকে সংকটাপন্ন করে তুলতে পারে। বাচ্চার মাইগ্রেন থাকলে ডাক্তারই তাকে কখনো কোন ঔষধ খেতে হবে তা বলে দিবে।

আপনার বাচ্চার যদি স্প্লিটিং মাথাব্যথা থাকে তাহলে তা চিন্তার বিষয়ই। যদি এই ধরণের মাথাব্যথা হয় খুব কম।

ডাক্তারকে ডাকুন যদি এমন হয় যে:

  • সাধারণের চেয়ে হঠাৎ করে তীব্র ব্যথা হচ্ছে
  • সহজে ব্যথা ছাড়ছেই না
  • অতিরিক্ত পীড়াদায়ক হলে

এটি মূলত সকালে ঘটে (যখন আপনার বাচ্চা জেগে উঠবে মানে ব্যথা তাকে জাগিয়ে দিবে)

মাইগ্রেনের মাথাব্যথা থেকে বমি হয়; Image source: travellingadd

মাথাব্যথার পাশাপাশি আপনার বাচ্চার যদি অন্যান্য কিছু উপসর্গ থাকে তাহলে ডাক্তারকে অবগত করুন।
যেমন:

  • বমি করলে
  • আঘাত পাওয়ার পর থেকে মাথাব্যথা করলে বা চৈতন্য হারালে
  • হৃদরোগের ক্রোক হলে
  • দৃষ্টিসংক্রান্ত পরিবর্তন এলে
  • বেহুঁশ হয়ে গেল
  • দুর্বল বোধ করলে
  • অবিচক্ষণতা বা জবরজঙ্গতা দেখা গেলে
  • চামড়ায় ফুঁসকুড়ি
  • হাঁটাকালীন বা দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হলে
  • কথা বলতে ক্লিষ্ট অনুভব করলে
  • ঘাড়ে ব্যথা বা কাঠিন্যতা
  • জ্বর বা অন্যান্য সংক্রমণের লক্ষণ
  • ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন এলে
  • অতিরিক্ত পান করা বা প্রস্রাব হলে
  • বিদ্যালয়ে নিয়মিত না গেলে এবং প্রাত্যহিক কাজেও অনিয়মিত হলে।