বেশিরভাগ বাবা-মা ই এই সত্যটা মানতে নারাজ যে তাদের সন্তানেরা হাইস্কুল কিংবা কলেজে পড়ুয়াকালীন সময়টাতে এলকোহল বা নেশাজাতীয় কোনো দ্রব্যের স্বাদ নিতে পারে। জরিপে দেখা গেছে পাশ্চাত্য দেশগুলোতে হাইস্কুল পড়ুয়া প্রায় ৮০% বাচ্চাই এলকোহলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। শুধু পাশ্চাত্যে নয় আমাদের দেশেও ইদানীং তার বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে লক্ষণীয়।

ধীরে ধীরে মদ্যপানের পরিণতি করুণ হয়ে উঠে | © Familydoctor

স্বাভাবিকভাবেই যেহেতু বাচ্চাদের শরীর কোনো নেশাদ্রব্যের জন্য উপযোগী নয় তাই প্রত্যেক বাবা-মায়ের উচিত তার বেড়ে উঠা সন্তানের সাথে এলকোহলের ব্যবহার এবং অপব্যবহারের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে আলোচনা করা।

এলকোহল অপব্যবহারের ক্ষতিকর দিকগুলো :

এলকোহল একজন ব্যক্তির ভালো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং বাস্তবিক উপলব্ধিতে ব্যাঘাত ঘটায়। পূর্ণবয়স্কদের তুলনায় তরুণ এবং বাচ্চাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভিজ্ঞতা আরো কম হওয়ায় এলকোহল তাদের জন্য আরো বেশি বিপজ্জনক।

মদ্যপানের দরুণ স্বল্প-মেয়াদী যে প্রভাবগুলো সৃষ্টি হয় :

শুরুতে যে সমস্যাগুলো দেখা দেয় | © Express.co.uk

বিকৃত দর্শনশক্তি, শ্রবণশক্তি এবং অনুভূতি এবং আবেগের রদবদল যা বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয় যার কারণে দুর্ঘটনা, ডুবে যাওয়া, অনিরাপদ যৌনমিলন এবং অপরিমিত ঔষধ গ্রহন যা মৃত্যু ডেকে আনে তেমন নানাবিধ বিপজ্জনক আচরণ দৃষ্টিগোচর হয়।

দীর্ঘমেয়াদী যে প্রভাবগুলো দেখা যায় :

সিরোসিস, যকৃতের ক্যান্সার, ক্ষুধামন্দা, ভিটামিনের অভাব, পাকস্থলীর রোগ, হৃদপিণ্ড এবং স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, স্মৃতি শক্তি হ্রাস, দুর্বলতা বৃদ্ধি পাওয়া, অতিরিক্ত মদ্যপানের দরুণ এই সমস্যাগুলো সৃষ্টি হয়।

শৈশব হচ্ছে আবিষ্কার করা এবং শেখার বয়স। তাই বাচ্চাদেরকে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করুন এবং এমন সব টপিক নিয়ে আলোচনা করে তাকে বুঝানোর চেষ্টা করুন কোনটি ভালো এবং কোনটি মন্দ। কারো দ্বারা বাচ্চারা এলকোহলের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার আগেই তাকে না বলতে শেখান।

বাচ্চাদেরকে ‘না’ বলতে শেখান :

যেকোনো মাদকদ্রব্যকে না বলতে শিখুন ও শেখান © Elementsbehaviouralhealth

নানারকম উপায়ে আপনি বাচ্চাদেরকে এলকোহলের দিকগুলো সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে পারেন।
তাদেরকে প্রশ্ন করতে শেখান। যদি কেউ তাকে কোনোকিছু গ্রহণ করতে উৎসাহিত করে তখন যেন সে প্রশ্ন করে, ‘এটা কী?’ এবং ‘এটা কোথায় থেকে এনেছো?’ উত্তরে যদি বুঝতে পারে এলকোহল জাতীয় কোনো দ্রব্য বাচ্চা যেন ‘না’ বলে দেবার মত সামর্থ্য অর্জন করে তা শেখানোর চেষ্টা করুন।

তাদেরকে বুঝাবেন যেন অস্বস্তিকর কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে সাথে সাথেই যেন সে জায়গাটা তারা ত্যাগ করে। তাদেরকে প্রয়োজনীয় একটি ফোন নাম্বার বা পরিবহনের জন্য পরিমিত টাকা দিন যেন তারা বিশেষ কোনো দরকারে তা ব্যবহার করতে পারে। তাদেরকে নিশ্চিত করুন মদ্যপ কারো সাথে যেন তারা গাড়িতে না চড়ে।

বিপজ্জনক নিয়ামকগুলো :

পারিবারিক বিরোধের প্রভাবে বাচ্চার মানসিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় © bettersover

অবস্থান্তরের সময়ে যেমন বয়ঃসন্ধির সূচনায় বা বাবা-মায়ের ডিভোর্সের কারণে বাচ্চারা এলকোহলের দিকে ঝুঁকে যেতে পারে। তাই বিষণ্ণতার মুহূর্তগুলোতেও বাচ্চাদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করুন এলকোহল কখনো মুক্তির পথ হয়ে দাঁড়ায় না বরং আরো জঘন্য এবং খারাপ একটা সময় ডেকে আনে।

যে বাচ্চাদের নিজের উপর শ্রদ্ধা কম বা আত্ম-নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কম তারা মূলত এলকোহলের অপব্যবহার করতে আগ্রহী হয়ে পড়ে। নিজেদের প্রতি বিশ্বাস কম হওয়ায় তারা মনে করে কোনো সমস্যাই তারা মোকাবেলা করতে পারবে না তাই নিজেদেরকে ভালো কোন উপায়ে সময় না দিয়ে তারা বরং হতাশায় ভুগতে থাকে।

যে বাচ্চারা নিজেদের পরিবার কিংবা অন্যদের সাথে সামাজিকভাবে সংযুক্ত থাকা থেকে পিছিয়ে কিংবা যারা কোনোভাবে নিজেকে ব্যতিক্রম মনে করে (যেমন বাহ্যিকভাবে দেখতে, আর্থিক পরিস্থিতি হিসেবে ইত্যাদি) তারাও এই ঝুঁকিটাতে থেকে যায়।

প্রকৃতপক্ষে তাদের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয় হচ্ছে পরিবারের মানুষগুলো থেকে ভালোবাসা, যত্ন, আস্থা পাওয়া। যে বাচ্চারা পরিবারের সদস্যদের সাথে খুব ভালো একটা বোঝাপড়ায় থাকে এবং সম্পূর্ণরূপে যত্নাদি পায় তারা এলকোহলের দিকে ঝুঁকে খুব কম।

সাধারণ কিছু পরামর্শ :

সৌভাগ্যবশত বাচ্চাদেরকে এলকোহলের অপব্যবহার থেকে সরিয়ে রাখতে বাবা-মা ই পারে সবচেয়ে বড় ভূমিকাটি পালন করতে।

সন্তানদের সময় দিন | © stocksy.com

একজন নীতিবান আদর্শ হয়ে প্রতীয়মান হোন সন্তানের কাছে। একটু ভেবে দেখুন নিজেও যদি মাদকসেবন করে সন্তানের কাছে তা কিভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। কোনো পার্টি বা সামাজিক অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র নন-এলকোহলিক বেভারেজ রেখে বাচ্চাদের দেখান সবাই এলকোহল ছাড়াই কি দারুণ মজা করতে পারে।

নিজে আগে এলকোহল সম্পর্কে ভালোমতো জানুন তাহলে শেখাতে পারবেন বাচ্চাকেও। তথ্য সংগ্রহ করুন এবং বাচ্চা, বাচ্চার বন্ধু, তাদের বাবা-মাকে এর অপকারিতা সম্পর্কে পড়ে শোনান। বাচ্চাকে তার নিজের সম্পর্কে শ্রদ্ধা বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করুন।

যেমন, আপনার সন্তান যখন নিজে নিজেই ভালো কিছু একটা করতে পারবে তাকে বাহবা দিন এবং উৎসাহিত করুন, তাকে বুঝান সে চাইলেই আরো ভালো কিছু করতে পারবে। কোনো বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতে বাধা দিন, বড় কারো সাথে শেয়ার করে তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে সমস্যা সমাধানের জন্য বাচ্চাকে উৎসাহিত করুন।

লক্ষণগুলো সম্পর্কে নিশ্চিত হোন :

আক্রমণাত্মক ব্যবহার ও একা থাকার প্রবণতা | © Childswork

এলকোহল গ্রহণ শুরু করলে বাচ্চার মেজাজ বা আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দেয়। খেলাধুলা, কাজকর্ম বা স্কুলের প্রতি আকর্ষণ কমে আসে। পরিবার, বন্ধু বান্ধবের সঙ্গ ত্যাগ করে নির্জনতা বেছে নেয় কিংবা নতুন কোনো বন্ধু সংঘ বেছে নেয়। প্রাত্যহিক শৃঙ্খলায় ব্যাঘাত দেখা যায়। চিন্তাভাবনার বিশৃঙ্খলা দেখা যায়।

এগুলোর মধ্যে এক বা দুইটি কারণ দেখা গেলে খুব বেশি চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। বয়োঃসন্ধিকাল হচ্ছে পরিবর্তনের সময়। শারীরিক, সামাজিক, বুদ্ধিমত্তা কিংবা আবেগ সবদিক থেকেই তখন পরিবর্তন দেখা যায়। তখন কিছুটা খেয়ালী মনোভাব বা মুড সুইং দেখা যায় যা সময়ের সাথে সাথে বাচ্চা নিজেই ঠিক করে নেয়।

তবে বাচ্চা যদি এলকোহলিক হয়ে পড়ে তার মধ্যে অনেকগুলো কারণ একসাথে দেখা যায়। বন্ধুবান্ধব, ব্যবহার, পোশাক, মনোভাব, মেজাজ সবকিছুতেই লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যায়। এমনটা দেখলে প্রথমে বাচ্চার সাথে সুন্দর করে খোলাখুলি কথা বলুন তবে প্রথমেই সন্দেহজনক আচরণ দেখাবেন না।

অন্যান্য যে পরামর্শগুলো কাজে লাগতে পারে :

বাচ্চার বন্ধু বাবা-মায়ের সাথে পরিচিত থাকুন। নিজেকে নিশ্চিত করুন যেখানেই যান বাচ্চার সাথে যোগাযোগ করার জন্য একটা ফোন নাম্বার যেন থাকে। সন্তান বাড়ির বাইরে থাকলে তার গতিবিধি সম্পর্কে সজাগ থাকুন। বাচ্চাকে সময় দিন। দীর্ঘ সময়ের জন্য বাড়ির বাইরে থাকলে ফোন কল, ইমেইল, টেক্সট, বাড়িতে এসে দেখে যাওয়া মোদ্দাকথা যেভাবেই হোক সন্তানের সাথে কানেক্ট থাকুন।

বাচ্চার সাথে খোলাখুলি কথা বলুন, তাকে বলতে দিন | © Very well mind

যারা কিশোর বিশেষত গাড়ি চালানোর মতো যথেষ্ট হয়েছে তাদের সাথে আচরণগত একটা চুক্তিতে আসুন। আচরণে বুঝিয়ে দিন তাকে নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী এবং ড্রাইভিং-এর সময় আনুষঙ্গিক সব নিয়মগুলো যেন সে মেনে চলে। কাজ শেষে প্রয়োজনে তার কাছ থেকে চাবিটি নিয়ে নিন।

মোদ্দাকথা, কিশোর বা শিশু সবার সাথে পারিবারিক বন্ধনটি দৃঢ় রাখুন এবং তাদেরকে আত্মবিশ্বাসী হয়ে গড়ে উঠতে সাহায্য করুন। এমন একটি সম্পর্ক স্থাপন করুন যেন প্রয়োজনে নিজের সমস্যার সবটাই আপনার কাছে খুলে বলতে পারে।

Featured Image : Daily mail