রাত দুইটা বাজে। কাল সকাল সাড়ে আটটায় অফিসে যেতে হবে। কিন্তু আপনার চোখে এক ফোঁটাও ঘুম নেই। বিছানায় শুয়ে আছেন। চেষ্টা করছেন ঘুমানোর। ঘুমের বদলে শুধু বিছানার এপাশ থেকে ওপাশ ফেরা হচ্ছে। অনেক্ষণ ধরে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকছেন সিলিং ফ্যানের দিকে। কিন্তু ঘুমের কোনো খোঁজ নেই। এভাবে প্রায় দুই ঘণ্টা পার হয়ে গেলো।

ভোরের আলো ফোটার কিছুক্ষণ আগে ঘুম আসলো ঠিকই। কিন্তু মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই অফিসে পৌঁছাতে হবে এই দুশ্চিন্তায় বেশিক্ষণ টিকলো না এই ঘুম। আর কোনো উপায় না পেয়ে এই ছাড়া ছাড়া ঘুম নিয়েই পৌঁছাতে হলো অফিসে। অফিসের কাজের চাপে চোখ থেকে রাতের সেই অপর্যাপ্ত ঘুমের চাহিদাও চলে গেলো। কিন্তু এই “ঘুম না আসা” রোগ আপনার পিছু ছাড়েনি। পরের দিনও একই কাহিনী ঘটতে থাকলো। এভাবে অপর্যাপ্ত ঘুম আমাদের সকলের শরীর, মন ও কাজের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

যেকোনো বয়সের মানুষ ইনসমনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে ; Source: yesofcorsa.com

এতক্ষণ যে “ঘুম না আসা” রোগের কথা বলা হলো, তার নাম ইনসমনিয়া। এটি একটি স্লিপিং ডিজঅর্ডার। যেকোনো বয়সের লোক এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। চলুন তাহলে এই রোগের কিছু খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

ইনসোমনিয়া আসলে কী?

ডাক্তারদের মতে, ঘুমানোর দরকার হলেও ঘুমাতে না পারার অক্ষমতাকে ইনসমনিয়া বলে। আবার ঘুমিয়ে পড়লে স্বল্প সময়ের মধ্যে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়াকেও ইনসমনিয়া বলে। কোনো ব্যক্তির মাঝে এই ঘুম না হওয়ার প্রবণতা কয়েকদিন ধরে চলতে থাকলে সেই ব্যক্তিকে ইনসমনিয়াক বলে।

ইনসমনিয়া প্রধানত দুই প্রকার। এগুলো হলো অ্যাকিউট ইনসমনিয়া এবং ক্রনিক ইনসমনিয়া। অ্যাকিউট ইনসোমনিয়াকে স্বল্পমেয়াদী ইনসমনিয়াও বলা হয়। সাধারণত পরীক্ষা চলাকালীন দিনগুলোতে কিংবা বিভিন্ন দুশ্চিন্তা থেকে অ্যাকিউট ইনসমনিয়া হয়। এটি সাধারণত দুই থেকে তিন দিনের বেশি স্থায়ী হয় না। তাছাড়া এর জন্য আলাদা কোনো চিকিৎসার প্রয়োজনও হয় না।

ক্রনিক ইনসোমনিয়া হলো দীর্ঘমেয়াদী ইনসোমনিয়া। একজন লোকের সপ্তাহে তিন থেকে চারদিন ঘুমের অসুবিধা হলে এবং তিন মাস পর্যন্ত এই সমস্যা স্থায়ী হলে তাকে ক্রনিক ইনসমনিয়াক বলে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এ ধরনের মানুষের শরীর, মন ও দৈনন্দিন জীবনে ব্যাপক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। তাই কারো দীর্ঘদিন ধরে এই ঘুমের সমস্যা থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

স্লিপিং ডিজঅর্ডারগুলোর মাঝে ইনসমনিয়া অন্যতম মারাত্মক রোগ ; Source: regipnoz.ru

ইনসমনিয়া কেন হয়?

ইনসমনিয়া হাজারটা কারণে হতে পারে। মূলত ঘুমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে এমন যেকোনো কিছু ইনসমনিয়া রোগ হওয়ার কারণ হতে পারে। হতে পারে তা সারারাত ধরে ইন্টারনেট ব্রাউজ করা কিংবা টিভি দেখা। হতে পারে একদিনের তুলোনায় বেশি কাজের চাপ। আবার নানা রকম দুশ্চিন্তা এই রোগ সৃষ্টির কারণ হতে পারে। আমাদের অনিয়মে ভরা জীবনধারা ও কিছু বদঅভ্যাস এই রোগ বয়ে আনতে পারে।

নানা রকম রোগ থেকেও ইনসমনিয়ার আবির্ভাব ঘটতে পারে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বাতের ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, শরীরে দীর্ঘমেয়াদি যন্ত্রনা, স্লিপ অ্যাপনিয়া (ঘুমন্ত অবস্থায় অনিয়মিত শ্বাসপ্রশ্বাস) এবং নানা প্রকার স্নায়বিক রোগ। আমরা কী ধরনের ঔষধ সেবন করছি তার উপরও এই রোগ নির্ভর করে। বিভিন্ন মানসিক সমস্যা যেমন বিষণ্ণতা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করা, স্কিৎজফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসঅর্ডার ইত্যাদি থেকে এই রোগের আবির্ভাব ঘটতে পারে।

আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভাস ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ইনসোমনিয়া সৃষ্টির পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ। ঘুমানোর আগে ভারী খাবার খাওয়া, ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল সমৃদ্ধ পানীয় পান করা, ধুমপান, ঘুমের অনিয়ম ইত্যাদি ইনসমনিয়া সৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

দুশ্চিন্তা ইনসোমনিয়া হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ ; Source: wallup.net

এই রোগের লক্ষণসমূহ

একজন ইনসমনিয়াকের মাঝে নানা ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এগুলো নিচে ব্যাখা করা হলো:

১. চোখে ঘুম থাকলেও রাতে ঘুম না আসা।

২. ঘুম আসলেও বেশিক্ষণ ঘুমাতে না পারা।

৩. সারারাত ঘুমালেও ঘুম থেকে উঠার পর দুর্বল অনুভব করা।

৪. দিনের বেলা অবসাদ ও ঘুম-ঘুম ভাব থাকা।

৫. দুশ্চিন্তা, হতাশা ও বিষণ্ণতা বেড়ে যাওয়া।

৬. বিভিন্ন কাজে সঠিকভাবে মনোযোগ দিতে না পারা।

৭. ছোট ছোট বিষয় ভুলে যাওয়া।

৮. দুশ্চিন্তা থেকে মাথাব্যথা।

৯. ঘুম আসছে না কেন তা নিয়ে বাড়তি দুশ্চিন্তা করা।

এরকম আরো বিভিন্ন সমস্যা একজন ইনসমনিয়াকের মাঝে দেখা যায়। কারো মাঝে দীর্ঘদিন ধরে এমন লক্ষণ প্রকাশ পেলে দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

অযথা দুশ্চিন্তা মাথাব্যথা ও ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় ; Source: lark.com

রোগ থেকে প্রতিকারের উপায়

ইনসমনিয়া রোগের চিকিৎসা যতটা না ঔষধগত, তার থেকে বেশি আচরণগত। ঘুমের অভাবে ভোগা ইনসমনিয়াকরা বিভিন্ন থেরাপির মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। ইনিসমনিয়ার ঔষধগত, মানসিক ও আচরণগত চিকিৎসা রয়েছে। কোন ধরনের চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে তা ডাক্তারি পরামর্শের উপর নির্ভর করে। একজন ইনসমনিয়াকের বিছানা, ঘুম ইত্যাদির প্রতি অনীহা তৈরি হয়। ঘুমানোর সময় ফোন ও কম্পিউটার চালানোর মতো অভ্যাসে আসক্ত হয়ে পড়ে। একারণে ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত আধ ঘণ্টা আগে এসব ডিভাইসের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

ক্রনিক ইনসমনিয়ায় ভোগা রোগীদের ডাক্তারের পরামর্শে ঘুমের ওষুধ নেওয়া যেতে পারে। তবে এসব ওষুধের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা আবার হিতে বিপরীত আনতে পারে। এ ব্যাপারে তাই সতর্ক থাকতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন থেরাপিতে অংশ নেওয়া অনেক কার্যকরী। শোবার স্থান সর্বদা পরিচ্ছন্ন থাকলে ঘুম দ্রুত আসে। অগোছালো জীবনযাপন পরিহার করে একটি নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চললে এই রোগ থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব।

ঘুমানোর সময় ফোন ব্যবহার করা একটি খারাপ অভ্যাস; Source: shutterstock.com

ইনসমনিয়া রোগটি থেকে পুরোপুরি সুস্থ হতে কতদিন সময় লাগবে তা ব্যক্তির উপর নির্ভর করে। কখনো কয়েক সপ্তাহের মধ্যে স্বাভাবিক ঘুমের রুটিনে ফিরে আসা সম্ভব। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েক মাসও লাগতে পারে।

পরিমিত ঘুম স্বাস্থ্য ও মন ভালো রাখে; Source: shutterstock.com

একটি পরিতৃপ্ত ঘুম আমাদের মস্তিষ্ককে শতভাগ বিশুদ্ধ করে প্রস্তুত করে জীবনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। তাই ঘুম অনেক জরুরী। কোনো কারণে এই “ঘুম না আসা” রোগ বা অন্য যেকোনো স্লিপিং ডিজঅর্ডারের লক্ষণ দেখা দিলে তা বিন্দুমাত্র অবজ্ঞা না করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরী।