সম্প্রতি এক গবেষণায় চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি টেলিভিশন দেখা কমিয়ে দেয় এবং সকালে ভরপেট নাশতা করে তবে তার হৃদরোগ ও স্ট্রোকের হবার ঝুঁকি
কমে যেতে পারে। গ্রিসের ক্যাপডিষ্ট্রিয়ান ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট কার্ডিওলজি ক্লিনিকের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ড. সোটিরিওস সালামান্দ্রিস (Dr. Sotirios Tsalamandris) দুটি ভিন্ন গবেষণা পরিচালনা করেছেন। তাদের এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকান কলেজ অফ কার্ডিওলজির বার্ষিক বিজ্ঞান অধিবেশনে।

শৈশব থেকে অতিরিক্ত টেলিভিশন দেখার অভ্যাস পরিহার করা উচিত, Source: NewsNation

হৃদপিন্ডের পরিস্থিতি বোঝার জন্য গবেষকরা প্রত্যেকের কার্ডিয়াক পালস ওয়েভ ভেলোসিটি (Carotid-Femoral Pulse Wave Velocity) এবং ধমনীর প্রাচীরের পুরুত্ব পর্যবেক্ষণ করেন। অস্বাভাবিক কার্ডিয়াক পালস ওয়েভ ভেলোসিটি এথেরোস্ক্লেরোসিস নিদেশ করে। এথেরোস্ক্লেরোসিস হলে ধমনীর প্রাচীরে চর্বি জাতীয় পদার্থের প্রলেপ পড়ার কারণে ধমনীর ভেতরের জায়গা সরু হয়ে যায়। ফলে রক্ত প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়। আর এ থেকেই পরবর্তীতে স্ট্রোক বা হার্ট এটাকের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।

যেভাবে টেলিভিশন হৃদরোগের কারণ হতে পারে

ড. সোটিরিওসের একটি গবেষণা ছিল টেলিভিশন কিভাবে হৃদপিণ্ডে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে তা নিয়ে। এর জন্য ড. সোটিরিওস ও তার সহকর্মীরা গ্রিসের ৪০ থেকে ৯৯ বছর বয়স্ক প্রায় দুই হাজার জন ব্যক্তির বিভিন্ন অভ্যাস এবং তাদের হৃদপিণ্ডের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। এদের মধ্যে অনেকেই হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং অনেকে হৃদরোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকিতে ছিলেন।

দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে বাড়তে পারে ওজন, Source: The Herald

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদেরকে তাদের টেলিভিশন দেখার অভ্যাস অনুযায়ী ৩ ভাগে ভাগ করা হয়।

  • প্রথম গ্রূপে যারা ছিলেন তারা সপ্তাহে ৭ ঘণ্টা বা তার চেয়ে কম সময় টেলিভিশন দেখে ব্যয় করতেন। এই গ্রূপের নাম দেয়া হয় লো গ্রূপ।
  • দ্বিতীয় গ্রূপের সদস্যরা সপ্তাহে প্রায় ৭ থেকে ২১ ঘণ্টা টেলিভিশন দেখেন। এই গ্রূপকে বলা হয় মডারেট গ্রূপ।
  • তৃতীয় গ্রূপের সদস্যরা সপ্তাহে ২১ ঘন্টার চেয়েও বেশি সময় টেলিভিশন দেখে কাটাতেন। আর এই গ্রূপকে নাম দেয়া হয় হয় গ্রূপ।

গবেষণায় দেখা যায়, যারা হাই গ্রূপের সদস্য অর্থাৎ যারা অনেক বেশি টেলিভিশন দেখেন তাদের ধমনীগাত্রের পুরুত্ব বেড়ে যাবার আশংকা লো গ্রূপের সদস্যদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। এ থেকে তারা সিদ্ধান্তে আসেন যে, যারা যত বেশি টেলিভিশন দেখেন তাদের হার্টের সমস্যা হবার সম্ভাবনা তত বেশি।

এছাড়াও ফলাফলে জানা গিয়েছে যে, যারা বেশি মাত্রায় টেলিভিশন দেখেন তাদের উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়বেটিস হবার আশঙ্কাও বেশি থাকে। লো গ্রূপের তুলনায় হাই গ্রূপের সদস্যদের উচ্চ রক্তচাপ হবার আশঙ্কা প্রায় ৬৮ শতাংশ বেশি। আবার লো গ্রূপের তুলনায় হাই গ্রূপের সদস্যদের ডায়বেটিস হবার আশঙ্কা প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।

এর কারণ হিসেবে তারা বর্ণনা করেন যে, টেলিভিশন দেখার ক্ষেত্রে যারা বেশি সময় ব্যয় করেন তারা অধিক সময় বসে কাটান। ফলে শারীরিক গতিবিধি ও দৈনন্দিন কার্যক্রমও কম করা হয় বলে খাবারের সাথে গৃহীত ক্যালরি খরচ হয় না। যা মেদ আকারে শরীরের বিভিন্ন অংশে এমনকি ধমনীগাত্রেও জমা হতে থাকে। এতে শরীরের ওজন বৃদ্ধি পায়। এর ফলে হৃদ রোগ, স্ট্রোকের ঝুঁকি, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি জটিলতা দেখা দেয়।

ড. সোটিরিওস বলেন –

এ গবেষণা থেকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ হয় যে, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার যেকোনো কাজ শরীরের জন্য বিশেষ করে হৃদপিণ্ডের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই গবেষণার ফলাফল জানার পর প্রত্যেকের উচিত টেলিভিশনের রিমোর্টের অফ বোতামে চাপ দিয়ে নিজের যদি থেকে উঠে পড়া। ন্যূনতম গৃহস্থলীর কাজ এমনকি ঘুরতে যাওয়া বা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে সময় কাটানোও শরীরের জন্য টেলিভিশন দেখা তথা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার চেয়ে উত্তম।

টেলিভিশন দেখার সময়ও ব্যায়াম করুন, Source: The Polyclinic

তবে তিনি এটাও বলেন যে, টেলিভিশন দেখার প্রতি তীব্র নেশা থাকলে শরীরের ক্ষতি না করেও এটি দেখার কিছু উপায় রয়েছে। টেলিভিশন দেখার সময় অর্থাৎ টেলিভিশন দেখতে দেখতে আপনি যদি হালকা ব্যায়াম, ভার উত্তোলন বা ঘরের কোনো কাজ করতে থাকেন তবে শরীরের ক্যালরি খরচ হতে থাকবে এবং রক্ত প্রবাহের মাত্রা ঠিক থাকবে। এতে টেলিভিশন দেখলেও তা শরীরের ক্ষতি করবে না।

যে কারণে ভরপেট আহার করবেন সকালের নাশতায়

এ গবেষণার পরবর্তী ও শেষ অংশে সকালের নাশতায় উচ্চ ক্যালরি যুক্ত খাবার গ্রহণ করতে বলা হয়। সকালের নাস্তার পরিমাণ কিভাবে হৃদপিণ্ডের সুস্থতায় ভূমিকা রাখে তা পর্যবেক্ষণের জন্য গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদেরকে বিভিন্ন গ্রূপে ভাগ করা হয়।

সকালের নাশতায় ভারী খাবার খাওয়া উত্তম, Source: NDTV Food

  • প্রথম গ্রূপের সদস্যরা সকালের নাশতায় ভারী খাবার তথা উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার যেমন পনির, মধু, দুধ, রুটি, ছাতু ইত্যাদি গ্রহণ করে থাকেন। এই গ্রূপকে বলা হয় হাই এনার্জি গ্রূপ।
  • দ্বিতীয় গ্রূপের সদস্যরা সকালের নাশতায় হালকা খাবার গ্রহণ করেন যেমন লো ফ্যাট দুধ, কফি, ফলমূল, রুটি, মধু ইত্যাদি। এই গ্রূপকে বলা হয় লো এনার্জি গ্রূপ।
  • তৃতীয় গ্রূপের সদস্যরা সকালে কোনো নাশতাই গ্রহণ করেন না।

গবেষণায় দেখা যায়, হাই এনার্জি গ্রূপের সদস্যদের হৃদপিণ্ড তুলনামূলকভাবে বেশি সুস্থ। সকালের নাশতায় যা-ই গ্রহণ করা হোক না কেন সারাদিনের কর্মকান্ডে তা হজম হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই সারাদিনে যতটা ক্যালরি গ্রহণ করা হয় তার ২০ শতাংশ সকালে গ্রহণ করা উত্তম।

সুঅভ্যাস দিতে পারে সুস্থ জীবন, Source:Dr. Kirti Vardhan Sahni

বর্তমানে অধিকাংশ বাড়িতে সুঅভ্যাস ও সঠিক নিয়মের অভাবে অল্প বয়সেই তরুণ তরুণীরা হৃদরোগে ভুগছেন। অকালে প্রাণও হারাচ্ছে অনেকে। অথচ কিছু ক্ষতিকর অভ্যাস বদলে সঠিক পন্থা মেনে চললে সুস্থ জীবন পেতে পারেন প্রত্যেকে।

Featured Image: Business Insider