রাগকে আমরা ক্রোধ বা রোষ বলেও জানি।
রাগ আমাদের আবেগের একটি বহিঃপ্রকাশ। এটি একটি অস্বচ্ছন্দ, প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি করে যার ফলে বেরিয়ে আসে বিরক্তি, আঘাত করা কিংবা ধমক হিসেবে।

রাগ যে শুধু মানসিকতার সাথে যুক্ত তাই নিয় এটি শারিরীক কিছু বিষয় যেমন হৃদক্রিয়া বাড়িয়ে দেয়, ব্লাড প্রেসার উন্নীত করে, এড্রেনালিন এবং নর-এড্রেনালিন হরমোনের প্রবাহ বাড়ায়। এদিক থেকে ভাবলে মনে হয় যে রাগ হচ্ছে মষ্তিষ্কের যুদ্ধ বা মষ্তিষ্কের অনুভূতির দৌড়ে ছুটে চলা।

মনোবিজ্ঞানীরা যদিও বলছেন রাগ একটি স্বাভাবিক আবেগ। কিন্তু এই রাগ ক্ষতির কারণ হয়েও দেখা দিতে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে ব্যক্তিজীবন, সামাজিক ও পেশাগত জীবনে। এমনকি স্বাস্থ্যের ওপরও রাগের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আর অল্পতেই রেগে যাওয়া বা হুট করে অতিরিক্ত রেগে যাওয়া আরো ক্ষতিকর ব্যাপার।

অতিরিক্ত রাগ স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর; Image source: mensline australia

হুট করে এমন রেগে গিয়ে খুন খারাবি পর্যন্ত হয়ে যাচ্ছে এমন ঘটনাও শোনা যায়। অনেকেই এমন আছেন যে খুব সাধারণ কথায়ও খুব বেশি রেগে যায়। এই স্বভাবের কারণে খুব কাছের মানুষের সাথেও অনেক ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়ে যায়। একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত রাগ মেনে নেয়া গেলেও মাত্রাবিহীন রাগারাগি কারও কাম্য নয়।

রাগ এমন পর্যায়ে চলে যাওয়ার আগেই সেটি নিয়ন্ত্রণ করা দরকার বলে মনে করেন মনোবিজ্ঞানীরা। আর রাগ কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব সে ব্যাপারেই কথা বলবো এখানে। চলুন দেখে নিই তেমন কিছু উপায় –

১) দূরত্বে চলে যান:

যার ওপর রেগে যাচ্ছেন, তাকে কিছু না বলে সে জায়গাটি থেকে সরে যান। তার সাথে তখনই নয়, বরং খানিক পরে কথা আবার কথা বলুন। কিংবা তাকে আর কিছু না বলে অন্য কারো কাছে রাগের কারণটি নিয়ে কথা বলুন তাতে কিছুটা মানসিক শান্তি পাবেন।

২) গভীর করে দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিন:

রেগে যাওয়ার মুহূর্তে নিঃশ্বাস নিন গভীর করে; Image source: MotherNatureNetwork

খুব বেশি রেগে গেলে মানুষের হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়। এসময় দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিন, তাহলে রাগ কমে যাবে। যখনই বুঝতে পারবেন যে আপনার রাগ হচ্ছে তখন গভীরভাবে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করুন।

পদ্ধতি হল, রাগ থেকে মনটাকে সরিয়ে নিশ্বাসের দিকে মনোযোগ দেয়া। বুক ভরে গভীর নিশ্বাস নেয়া, সেটাকে কিছুক্ষণ ধরে থাকা, কিছুক্ষণ পর বাতাস ছেড়ে দেয়া। এটি রাগ কমাতে সাহায্য করে।

আর গভীর শ্বাস তাৎক্ষণিকভাবে  মষ্তিষ্কের ভেতরে অক্সিজেনের প্রবাহ বাড়ায়, ফলে মাথায় রক্ত চলাচল বাড়ে। এতে খানিকটা স্বস্তি বোধ হয় এবং আপনার রাগও অনেকটা কমে যাবে।

৩) রেগে গেলে উল্টো গুনুন:

যখন আপনি রেগে যাচ্ছেন ১০০, ৯৯, ৯৮… এভাবে উল্টো দিক থেকে গণনা শুরু করুন। তাতে আপনার মনোযোগ এদিকে সরে আসবে, উল্টো দিক থেকে গণনা করলে রাগের কারণও ভুলে যাবেন।

৪) তাৎক্ষণিক কাজ:

যদি সম্ভব হয় যে কাপড়ে আছেন তাতেই গোসল করে ফেলুন। গোসল করলে মন মেজাজ, শরীর সবকিছুতেই প্রশান্তি আসে। রাগের কারণ শেয়ার করার মতো পাশে অন্য কেউ না থাকলে হাতের কাছে যদি বরফ থাকে তা হাত দিয়ে ধরে থাকুন। বরফ মেজাজ শীতল করতেও সহায়তা করে।

৫) ব্যায়াম করুন:

রাগের সময় ধীরে ধীরে ব্যায়াম করার চেষ্টা করুন। যোগব্যায়াম রাগ কমাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ব্যায়ামের ফলে আপনার ব্রেনে অক্সিজেন বেড়ে যায়, এনার্জি লেভেল বেড়ে যায়। শুধু রাগের সময়ই নয় প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই ব্যায়াম করুন।

ব্যায়াম শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। নিয়মিত ব্যায়ামে দেখবেন কিছু দিনের মধ্যেই আপনার আচরণে পরিবর্তন আসছে এবং আপনার মেজাজটা কেমন শান্ত হয়ে এসেছে।

৬) কথা বলুন নিজের সঙ্গেই:

নিজেকে বুঝান; Image source: psychology today

যখন খুব রেগে আছেন অন্য কাউকে না পেলে নিজেই নিজেকে কয়েকবার বলুন, ‘এগুলো কিছু না’, ‘তুমি তো বুঝদার মানুষ’, ‘শান্ত হও’, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’, ‘এগুলো জীবনের স্বাভাবিক অংশ’… এভাবে নিজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন। এই অটো সাজেশন আপনার রাগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করবে।

৭) ক্ষমা করে দিন:

মানবজীবনের অন্যতম অর্জন হচ্ছে ক্ষমা করতে শেখা। কারণ মানুষ ভুল করবে, এটাই স্বাভাবিক।তাই কেউ যখন আপনার সাথে ভুল করে বসবে তাতে রেগে যাওয়াটা মোটেও কোন বুদ্ধিমানের কাজ না। না রেগে গিয়ে ভাবুন সে ভুল করেছে, তাকে ক্ষমা করা উচিত। ক্ষমা করতে পারলে তা পরবর্তীতে আপনাকেই এক প্রকার প্রশান্তি এনে দিবে।

৮) ইতিবাচক চিন্তা করুন:

কারো উপর বা নিজের উপর না রেগে, রেগে যাওয়ার কারণ নিয়ে ইতিবাচক চিন্তা করুন। কিভাবে সমাধান করা যায় ভাবুন সেই ব্যাপারে। এভাবে আস্তে আস্তে ইতিবাচক চিন্তা শুরু কররে পারলে তা পরবর্তীতে আপনার হুট করে রেগে যাওয়া নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবে অনেকটাই।

৯) হাঁটতে বের হোন:

হাঁটুন এবং নিজেকে সময় দিন; Image source; flicker.com

রেগে গিয়ে চিৎকার না করে কিংবা কোনো কিছু ভাঙচুর না করে যার উপর রাগ হয়েছে তার সামনে থেকে সরে যান এবং অল্প সময়ের জন্য হলেও হাঁটতে বের হোন। তাতে আপনি কিছুটা হলেও ভাবার সুযোগ পাবেন আপনারও কোনো দোষ আছে কিনা। কিংবা দমাধানের একটি পথ পাবেন। বা প্রকৃতির চারপাশ দেখতে দেখতে কমে আসবে আপনার অযাচিত রাগ।

রেগে গেলে যা যা করবেন না:

কিছু কাজ আছে রেগে গেলে যা একদমই করা উচিত না। যেমন-

১) গাড়ি না চালানো:

রেগে গেলে গাড়ি চালনায় মনোযোগ থাকে না। তাই মাথায় রাগ নিয়ে গাড়ি চালালে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে অনেক বেশি। কাজেই মাথা ঠাণ্ডা রাখুন নতুবা গাড়ি চালাবেন না।

২) তর্ক করা থেকে বিরত থাকুন:

রাগের সময় তর্ক বন্ধ রাখুন; Image source: taborgroup

রাগের মাথায় তর্ক করাটা বিপদ্দজনক। তাতে বরং রাগ বাড়ে। তাই এ সময়টায় তর্ক না করাই ভালো। কারণ যুক্তিগুলো তখন ঠিকমতো উপস্থাপন করা যায় না। তাই তখন কথা না বাড়িয়ে রাগ কমার পর বিষয়টি নিয়ে কথা বলুন।

৩) ঘুমাতে যাবেন না:

মাথা ঠাণ্ডা না করে রাগ নিয়েই ঘুমাতে যাওয়া উচিত না। কারণ এই অবস্থায় ঘুমাতে গেলে নেতিবাচক আবেগগুলো ভেতরেই জমা থেকে যেতে পারে। বিশেষ করে যারা বেশি আবেগপ্রবণ তাদের বেলায়। এটি পরবর্তীকালে আরো ক্ষতি করে।

৪) যেখানে সেখানে শেয়ার নয়:

আমরা অনেকেই অল্প কিছুতেই গড়বড় করে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়ে ফেলি। রাগ-ক্ষোভ ফেসবুকে না। কারণ তখন আপনার আবেগ স্বাভাবিক থাকে না। বলে ফেলতে পারেন অনেককিছুই যা পরবর্তীকালে আপনার প্রতি মানুষের নেতিবাচক ধারণা তৈরির কারণ হতে পারে।

৫) মদ্যপান নয়:

মদ্যপান তো হারামই তার উপর রাগের মাথায় এটি একেবারেই অনুচিত একটি কাজ। এতে আবেগের অস্বাভাবিকতা আরো বেশি বৃদ্ধি পায়। রাগের বশে আপনি হয়ে উঠতে পারেন ভয়ংকর।

মোদ্দাকথা, রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন। তাই জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে জিততে চাইলে বশে আনুন নিজের রাগকেই।

Feature Image: Healing minds