অলিতে গলিতে ছোট বড় জটিল নানা রোগের নানা রকম চিকিৎসা নিয়ে অভিজ্ঞ অনভিজ্ঞ অনেকেই ব্যবসা করছেন সফলভাবে। আর এ রোগগুলোর একটি হলো এই পাইলস। শিশু সহ যেকোনো ব্যক্তি এতে আক্রান্ত হতে পারে যে কোনো সময় । তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মধ্যবয়স্ক থেকে বৃদ্ধ অনেকেই এই গোপন ও জটিল রোগে ভুগে থাকেন। সঙ্গত কারণেই সময়মতো চিকিৎসা করেন না অনেকেই। কিন্তু যদি এই রোগের কারণ, লক্ষণ ও ঘরোয়া চিকিৎসা ঠিকমতো জানা যায় তবে এই রোগ থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব সহজেই।

পাইলস হতে পারে শিশুদেরও, Source:
prolapserectum.com

পাইলস বা অর্শ্ব (Hemorrhoid) রোগে মলদ্বারের রক্তনালীগুলো ফুলে যায়। এতে মাংসপেশি মলদ্বারের বাইরে চলে আসে ফলে ব্যাথা ও অস্বস্তি হয়। পাইলসের সমস্যা সামান্য হলে অনেকসময় এটি বাইরে থেকে পরিলক্ষিত করা যায় না। তবে সমস্যা বেশি হলে মাংসপেশি ফুলে গিয়ে লাল বা গোলাপি আকার ধারণ করে।

যেসব কারণে পাইলস হতে পারে

যে সব কারণে মলদ্বারে চাপ সৃষ্টি হয় সে সব কারণেই পাইলস রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন:

  • অতিরিক্ত ওজন
  • মলত্যাগের সময় বেশি চাপ দেয়া
  • ঘন ঘন ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়া
  • নিয়মিত মলত্যাগ না হওয়া
  • দীর্ঘক্ষণ বসে থেকে কাজ করা বা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করা
  • গর্ভাবস্থায় বা প্রসবকালীন সময়ে
  • আঁশযুক্ত খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে না খাওয়া
  • কোষ্ঠকাঠিন্যের ওষুধ দীর্ঘকাল ধরে সেবন করা
  • বয়স হলে টিস্যুর স্থিতিস্থাপকতা কমে যায় ফলে তা শিথিল হয়ে পরে। তাই বৃদ্ধকালে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে

বিভিন্ন ধরণের পাইলস রোগ

পাইলস বা অর্শ্বরোগ অবস্থানের ভিত্তিতে এটি প্রায় ৩ প্রকার হয়ে থাকে।

  • বহিঃঅর্শ- যা মলদ্বারের বাইরে বের হয়ে আসে
  • অভ্যন্তরীণ অর্শ- যা মলদ্বারের ভেতরে অবস্থান করে এবং বাইরে থেকে দেখা যায় না
  • কখনও ২ অবস্থাই বিদ্যমান থাকতে পারে। অর্থাৎ এই অর্শ মলদ্বারের ভেতরে অবস্থান করলেও মলত্যাগের সময় এটি বাইরে বের হয়ে আসে।

অতিরিক্ত ওজন থেকেও পাইলস হতে পারে, Source: Daily Mail

এ রোগের ৪টি পর্যায় আছে।

  • প্রথম পর্যায়- অর্শ পায়ুপথের ভেতরে অবস্থান করে এবং কোনো অবস্থাতেই বাইরে বের হয়ে আসে না
  • দ্বিতীয় পর্যায়- মলত্যাগের পর অর্শ ফুলে বাইরে বের হয়ে আসে এবং পরে ধীরে ধীরে নিজের থেকেই ভেতরে চলে যায়।
  • তৃতীয় পর্যায়- পাইলস ফুলে বাইরে বের হয়ে এলে আপনা আপনি ঠিক হয়ে যায় না, রোগীকে ঠিক করতে হয়।
  • চতুর্থ পর্যায়- পাইলস ফুলে বাইরে বের হয়ে আসে এবং কোনোভাবে ভেতরে ঢোকানো যায় না।

কখন ডাক্তার দেখাতে হবে

যদি মলদ্বারে ব্যাথা বা জ্বালাপোড়া বা কোনো অস্বস্তিকর অনুভূতি হয় তবে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা প্রয়োজন। তবে যে লক্ষণগুলো দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে সেগুলো হলো:

  • মলদ্বারের চারপাশে চুলকানি হওয়া
  • মলদ্বারের চারপাশে জ্বালাপোড়া বা ব্যাথা হওয়া এবং ফুলে যাওয়া
  • মলের সাথে রক্ত বা পুঁজ বের হওয়া

যেভাবে এই রোগ যাচাই করা হয়

চতুর্থ পর্যায়ের বহিঃঅর্শ্ব যাচাই করার জন্য সরাসরি পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট। তবে অন্যান্য ধরণের ওরশ যাচাই এর জন্য ডিজিটাল রেক্টাল এক্সাম, সিগময়ডোস্কপি ইত্যাদি পরীক্ষা করা হয়।

পাইলসের বিভিন্ন চিকিৎসা

পাইলস হয়েছে ধারণা করলে ঘরোয়া প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে একটি গামলায় কুসুম গরম পানি নিয়ে তাতে সামান্য লবণ মিশিয়ে তাতে টানা দশ মিনিট বসে থাকতে হবে। এর পরেও অস্বস্তি না কমলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী মলম বা ওষুধ ব্যবহার করতে হবে।

কুসুম গরম পানিতে বসে থাকলে পাইলসের জ্বালা কমতে পারে, Source:
eBay

এছাড়াও যদি কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থেকে থাকে তবে ফাইবার ও তরল জাতীয় খাবার বেশি খেতে হবে। যেমন জুস, স্যুপ, শাকসবজি, ফলমূল ইত্যাদি। ইসোপগুলের ভুষি, এলোভেরার শরবত, পাকা কলা ইত্যাদি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে কার্যকর।

এছাড়া পাইলস হলে শৌচকার্যের পর সাবান ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। নরম ওয়েট টিস্যু ব্যবহার করা যেতে পারে। স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানির চেয়ে ঠান্ডা পানির ব্যবহার বেশি আরামদায়ক মনে হতে পারে।

রাবার ব্যান্ড লাইগেশন , Source: wiseGEEK

অনেক সময় অর্শের ফুলে যাওয়া যেন বাড়তে না থাকে সেজন্যে ডাক্তাররা রাবার ব্যান্ড ব্যবহার করতে পারেন। এ পদ্ধতিকে বলা হয় রাবার ব্যান্ড লাইগেশন। এ পদ্ধতিতে ডাক্তাররা রোগীর ফোলা অংশে নির্দিষ্ট রাবার ব্যান্ড লাগিয়ে দিতে পারে যেটি অর্শের ফুলে যাওয়াকে বাধা দেয় এবং তা কমে যেতে বাধ্য করে। তবে এই কাজটি দক্ষ মেডিকেল কর্মী দ্বারা করে নেয়া উচিত।

এছাড়াও ডাক্তার অর্শের জায়গায় একটি ইনজেকশনের মাধ্যমে ওষুধ দিয়ে দিতে পারেন যা খুব দ্রুত অর্শ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

ইনজেকশন গ্রহণের মাধ্যমেও পাইলসের যন্ত্রনা কমে, Source: bd.com

স্বাস্থ্যকর ও সঠিক নিয়মে খাবার গ্রহণ করলে পাইলস রোগ নিরাময় সম্ভব। তবে কোনো কারণে ঘরোয়া চিকিৎসায় যদি পাইলসের সমস্যা দূর না হয় তবে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সার্জারি করার প্রয়োজন হতে পারে।

পাইলস রোগ প্রতিরোধ করতে হলে আদর্শ খাবার রুটিন মেনে চলা একান্ত প্রয়োজন। প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ লিটার পানি খাওয়ার অভ্যাস কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। এছাড়াও প্রতিদিন ফাইবার জাতীয় খাবার গ্রহণ, অতিরিক্ত তেলযুক্ত বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবার না খাওয়া, দীর্ঘক্ষণ শক্ত জিনিসের উপর বসে থেকে কাজ না করা এবং শৌচকাজের সময় অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ না করা ইত্যাদি নিয়ম মেনে চললে পাইলস রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

Featured Image:Today’s Parent