আমাদের সৌন্দর্যের অন্যতম ধারক এই চুল। প্রতিদিন প্রায় একশ’টির উপর চুল পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু এই চুল পড়ার হার যখন বেড়ে যায় অতিরিক্ত পরিমাণে তা নিয়ে তখন আর আমাদের উদ্বেগের আর শেষ থাকে না। সম্প্রতি চুল বড় সমস্যা বড় একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এই সমস্যায় ভুগেছেন অনেকেই।

মাত্রাতিরিক্ত চুল পড়ার কারণে মাথার চুল পাতলা হয়ে যায় ফলে সৌন্দর্যেও ঘাটতি চলে আসে আমাদের। নানা রকম শ্যাম্পু ও তেল ব্যবহার করেও যখন কোনো ফলাফল পাচ্ছেন না তখন ঘরোয়া কিছু উপায় অবলম্বন করতেই পারেন আপনি!

তার আগে জেনে নিই কী কী কারণে মূলত চুল পড়ে:

১. অ্যান্ড্রোজেনের কারণে:

অ্যান্ড্রোজেনিক হরমোন যেমন টেস্টোস্টেরন, অ্যান্ড্রোস্ট্রেনডিয়ন, ডিএইচটি হরমোনগুলো সাধারণত পুরুষের বেশি ও মহিলাদের কম পরিমাণে থাকে। এ হরমোনগুলো হেয়ার ফলিকলের ওপর কাজ করে ও চুল পড়া ত্বরান্বিত করে। সে কারণে পুরুষের চুল বেশি পড়ে। তবে সবারই যে পড়বে তা নয়, যাদের এসব হরমোনের প্রভাব বেশি তাদের বেশি করে চুল পড়ে।

পুরুষের চুল পড়া বা টাক পড়া সাধারণত ২০ বছর থেকেই শুরু হতে পারে। এটিকে বলে মেল প্যাটার্ন অব হেয়ার লস বা পুরুষালি টাক। অর্থাৎ কপাল থেকে শুরু করে পেছন দিকে চুল উঠতে থাকে। মহিলাদের মেনোপজের সময় ও পরে অ্যান্ড্রোজেনিক হরমোনগুলো আনুপাতিক হারে বেড়ে যায়, তখন চুল বেশি করে পড়তে শুরু করে।

পুরুষদের মাথায় টাক হয়; Image Source: nsomoy

তবে এ ক্ষেত্রে ফিমেল প্যাটার্ন অব হেয়ার লস হয়ে থাকে। শুধু কপালের দিক থেকে নয়, চুল পড়া শুরু হয় পুরো মাথা থেকেই। ধীরে ধীরে চুলের ঘনত্ব কমে যায়। অ্যান্ড্রোজেনিক হরমোনই মেয়েদের চুল পড়া ও ছেলেদের টাকের সবচেয়ে বড় কারণ।

২. স্ট্রেস বা মানসিক চাপ:

দুশ্চিন্তায় ভুগলে বা মানসিক সমস্যা থাকলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি করে চুল পড়তে পারে। তবে এ চুল পড়া সাময়িক এবং পুনরায় চুল গজায়। তবে দীর্ঘদিন মানসিক দুশ্চিন্তায় থাকলে বা দুশ্চিন্তা কাটিয়ে উঠতে না পারলে অনেক বেশি চুল পড়ে যেতে পারে। দৈনিক ১০০টা পর্যন্ত চুল পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু এর চেয়ে বেশি পড়লে তা অবশ্যই উদ্বেগের কারণ।

বালিশ, তোয়ালে বা চিরুনিতে লেগে থাকা চুল গুনতে চেষ্টা করুন। অন্তত পরপর তিন দিন। অথবা অল্প এক গোছা চুল হাতে নিয়ে হালকা টান দিন। যদি গোছার চার ভাগের এক ভাগ চুলই উঠে আসে তবে তা চিন্তার বিষয়।

চুল পড়া রোধে ঘরোয়া উপায়

পেঁয়াজের রস:

পেঁয়াজের রস; Image Source: www.shajgoj.com

চুলকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পেঁয়াজের রস দারুণ কার্যকর। পেঁয়াজের রস মাথায় নতুন চুল গজাতেও সাহায্য করে। মাথার ত্বকে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং জীবাণুমুক্ত রাখতে সাহায্য করে।

প্রক্রিয়া: ১টি বড় পেঁয়াজ ভালো করে পিষে ছাকনি দিয়ে ছেকে রস বের করে নিয়ে রস পুরো মাথার ত্বক ও চুলে লাগিয়ে একঘণ্টা অপেক্ষা করুন। পেঁয়াজের গন্ধ বেশ তীব্র, যদি সহ্য না হয় তবে পেঁয়াজের রসের সঙ্গে গোলাপ জল মেশাতে পারেন। একঘণ্টা পর মাথা শ্যাম্পু দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিন।

চুল পড়ার পরিমাণের উপর নির্ভর করে প্যাকটি সপ্তাহে দুইবার ব্যবহার করা যাবে।

আলুর হেয়ার প্যাক:

আলুর হেয়ার প্যাক; Image Source: Vkool.com

আলু চুল পড়া বন্ধ করতে সাহায্য করে।

প্রক্রিয়া: আলু ৩ থেকে ৫ টা, ডিমের কুসুম একটি, মধু, ও অল্প পরিমাণের পানি নিন। প্রথমে আলু ভালো করে পিষে রস বের করে নিন। এবার তাতে ডিমের কুসুম , ১ চামচ মধু ও অল্প পানি মিশিয়ে নিন। প্যাকটি চুলে মেখে ৩০ মিনিট অপেক্ষা করুন। এরপর ভালো করে মাথা শ্যাম্পু করুন।

সপ্তাহে একদিন করেই কাজটি করুন। দেখবেন চুল পড়া কমে গিয়েছে।

নারকেলের দুধ:

নারকেলের দুধ; Image Source: Medical news today

চুলের সঠিক পুষ্টির জন্য নারকেল দুধের বিকল্প নেই।
নারকেলের দুধ চুলের ভেতর থেকে চুলকে মজবুত করে।

প্রক্রিয়া: প্রথমে নারকেল কুরিয়ে নিন। কোরানো নারকেল ব্লেন্ডারে বা পাটায় বেটে নিন ভালো করে। বেটে নেয়া নারকেল একটি পরিষ্কার পাতলা কাপড়ে রেখে চিপে ভালো করে নারকেলের দুধ বের করে নিন। অতিরিক্ত চুল পড়তে থাকলে প্রতিদিন চুলের গোড়ায় ভালোভাবে ম্যাসেজ করুন, যদি অতিরিক্ত না হয় তাহলে সপ্তাহে ২-৩ বার ব্যবহার করলেই ভালো ফল পাবেন।

মেহেদী, ডিমের সাদা অংশ ও টকদইয়ের প্যাক:

মেহেদী বাটা; Image Source: IndiaMart

মেহেদীর নির্যাস চুলের জন্য অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর, ডিম মাথার ত্বকে সঠিক পুষ্টি যোগাতে এবং চুলের ফলিকল মজবুত করে। টকদই চুল ও মাথার ত্বক আদ্র করে চুল পড়া বন্ধে সহায়তা করে।

প্রক্রিয়া: মেহেদী পাতা বাটা বা গুঁড়ো পরিমাণমতো নিয়ে এতে ১ টি ডিমের সাদা অংশ এবং ২-৩ টেবিল চামচ টকদই মেশান। চুল অনেক শুষ্ক হলে ভিটামিন ই ক্যাপস্যুল দিয়ে ভালো করে হেয়ার প্যাক তৈরি করে নিন। প্যাকটি চুলের গোঁড়া থেকে আগা পর্যন্ত ভালো করে লাগিয়ে নিন প্রায় ২ ঘণ্টা এভাবেই রেখে দিন।

এরপর সাধারণ ভাবে চুল ধুয়ে পরিষ্কার করে নিন। ভালো ফলাফল পেতে প্রথম দিন শ্যাম্পু না করে দ্বিতীয় দিন করুন। এই পদ্ধতিটি সপ্তাহে মাত্র ১ বার ব্যবহার করলেই চুল পড়া অনেকাংশে কমে যাবে।

কলার হেয়ার প্যাক:

মধু ও কলার প্যাক; Image Source: utmat.com

কলা চুলের জন্য খুবই কার্যকরী। চুল পড়া বন্ধ করতে ও চুলের রুক্ষতা দূর করতে এই প্যাকটি ব্যবহার করতে পারেন।

প্রক্রিয়া: মাঝারী সাইজের একটি পাকা কলা, মধু নিন।

কলাটিকে ভালো করে পেস্ট করুন। সাথে ২ চামচ মধু মেশান। এবার ভালো করে প্যাকটি চুলে ও মাথার ত্বকে লাগান। ৩০ মিনিট রাখার পর শ্যাম্পু করে নিন। সপ্তাহে একদিন প্যাকটি ব্যবহার করুন। চুল সুন্দর ও মজবুত হবে।

গ্রীনটি হেয়ার প্যাক:

গ্রীনটিতে আছে অ্যান্টি অক্সসিডেন্ট থাকে। অ্যান্টি অক্সসিডেন্ট চুল পড়া বন্ধ করতে সাহায্য করে।

প্রক্রিয়া: গ্রীনটি তৈরি করে হালকা গ্রীনটি সারা মাথায় লাগিয়ে ঘণ্টা খানেক বসে থাকুন। চুল শুকিয়ে গেলে ধুয়ে নিন। সপ্তাহে ৩ দিন ব্যবহার করুন।

চুলের জন্য উপকারী গ্রীনটি; Image Source: Healthline

ঘরোয়া উপায়গুলো বাদেও আপনি আর যা করতে পারেন:

ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা: বাজারে চুল পড়া রোধের জন্য মিনোক্সিডিল নামের ওষুধ পাওয়া যায়। এটি যেখান থেকে চুল পড়ছে সেখানে লাগাতে হবে। এটি নারী ও পুরুষ উভয়েই ব্যবহার করতে পারেন। এতে কাজ না হলে অন্য চিকিৎসা নিতে হবে।

লেজার থেরাপি এলএইচটি: লেজার থেরাপি হেয়ার ফলিকলগুলোকে আবার সজীব করে। এমনিতে প্রতিদিনই চুল পড়ে ও নতুন চুল গজায়। কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বা অন্য কোনো অসুস্থতার ফলে যে পরিমাণ চুল পড়ে যায়, সেই পরিমাণ গজায় না। লেজার থেরাপি চুলের গোড়ায় রক্ত সঞ্চালন ৫৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয় ও ফলিকলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে।

Feature Image: Longevitylife