নানান ধরণের ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের কারণে কানে ক্ষত বা সংক্রমণের সৃষ্টি হতে পারে। তা হতে পারে বহিঃকর্ণে (সুইমার’স ইয়ার), মধ্যকর্ণে (ওটিটিস মিডিয়া) কিংবা অন্তঃকর্ণে (রোলান্ড)। কিন্তু মধ্যকর্ণে সংক্রমণের পরিমাণ বেশি হয়।

বাচ্চাদের কানে ক্ষত সৃষ্টি হয় সবচেয়ে বেশি কারণ তাদের ইউস্টেশিয়ান টিউব আকারে ছোট হয়। ছোট হওয়ার ফলে ইয়ার ওয়াক্স, মিউকাস বা কোষগুচ্ছ, ধোঁয়া ইত্যাদির প্রদাহ এবং বাতাসের চাপের পরিবর্তনের ফলে বাচ্চাদের কান সহজেই ব্লক হয়ে যায়। শুধু যে বাচ্চারাই কানের সংক্রমণের আক্রান্ত হয় তা নয়, হয় বড়রাও।

লক্ষণ

কানের সংক্রমণ বাচ্চাদের হয় বেশি; Image source: Aviva romm

কানের প্রতিটি ক্ষতই শুরু হয় অল্প কিছু দিয়ে এমনকি আপনি হয়তো খেয়ালও করছেন না আপনার কান সংক্রমিত হতে যাচ্ছে। তবে

  • কানে ব্যথা অনুভূত হওয়া কিংবা অস্বস্তি অনুভব হচ্ছে সাধারণ লক্ষণ।
  • কানের ভেতরের তাপমাত্রাও তখন থাকে সামান্য বেশি (১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে)।
  • ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
  • দৃশ্যমান কোনো কারণ ছাড়াই বাচ্চারা কাঁদতে থাকে।
  • কান টানতে থাকে যা নিয়ে তারা বিরক্ত হচ্ছে।

কানের ভেতরটা দেখুন

প্রথম কাজটাই হচ্ছে কানের ভেতরে দেখে নেওয়া যে ক্ষতের কোনো লক্ষণ বা চিহ্ন দেখা যাচ্ছে কিনা। আপনি অটোস্কোপের সাহায্য বাড়িতেও এটি দেখে নিতে পারেন। নিজেরটা নিজে করা কষ্টসাধ্য তাই আপনার কাছের কারো সাহায্য নিন। আর আপনি যদি বাচ্চার কান পরীক্ষা করতে চান তা সহজ। আপনাকে অবশ্যই এটাও জানতে হবে কিভাবে কানের ভেতরটা দেখে।

কিছু অটোস্কোপে সুস্থ কান ও সংক্রমিত কানের উদাহরণ দেওয়া থাকে। তাছাড়াও আপনি চাইলে অনলাইনের সাহায্যে দেখে নিতে পারেন সংক্রমিত কান দেখতে কেমন দেখায়। যে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটি আপনাকে দেখতে হবে তা হলো ভেতরটা লাল কিংবা ফুলে আছে কিনা। কানের পর্দাও ফুলে যেতে পারে এবং তার আশেপাশের টিস্যুগুলোও।

অটোস্কোপের সাহায্যে কানের ইনফেকশন দেখা হয়; Image source: MyHealthAlberta

যত বেশি লাল এবং ফোলা থাকবে বুঝে নিতে হবে সংক্রমণের মাত্রাও তত বেশি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস যেটি লক্ষ করতে হবে যে কোনো পুঁজ দেখা যাচ্ছে কিনা বা কানের পর্দায় বিদারণ (ছোট ছোট ফুটা) আছে কিনা।

কানের ভেতরে তেমন কোনো অবস্থা যদি দেখে থাকেন তাহলে দুইটি উপায় থাকবে আপনার হাতে। ছোট সমস্যার জন্য বাড়িতেই প্রাকৃতিক চিকিৎসা করতে পারেন কানের। তবে পুঁজ বা বিদারিত পর্দা দেখলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

সাধারণ মেডিকেল চিকিৎসা

কানে সংক্রমণ হলে মূলত তিনটি ক্ষেত্র চোখে পড়ে।

  • ক্ষত
  • প্রদাহ
  • ব্যথা

চিকিৎসা নির্ভর করবে আপনার বাচ্চার বয়স, কানের ক্ষতের পরিমাণ এবং স্বাস্থ্যের অবস্থার উপর। যদি হালকা ক্ষত হয় এবং তা ক্রোনিক হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে ডাক্তার আপনাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিবে। সাধারণ কোনো পেইন রিলিভার খাওয়ার পরামর্শ দিবে। ৪৮-৭০ ঘন্টার মধ্যে তাতে যদি কাজ না হয় তাহলে আপনাকে এন্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করবে।

আপনি চাইলে বাড়িতেও প্রাকৃতিক উপায়ে কানের হালকা ক্ষতের চিকিৎসা করতে পারেন।

যেভাবে করবেন

যে উদ্ভিদে উপকারী উপাদান আছে সেগুলো ব্যবহারে আমাদের শরীর একটি স্বাস্থ্যকর পর্যায়ে চলে আসে এবং নির্দিষ্ট রোগ থেকে মুক্তি দেয়। তা হতে পারে ঔষধি গাছ কিংবা এসেনশাল অয়েল। আরো নানান ধরণের উদ্ভিজ্জ উপাদান ব্যবহৃত হচ্ছে আমাদের রোগবালাই দূরীকরণে।

তেমন কিছু রেসিপির কথা এখানে উল্লেখ করা হলো যা আপনার কানের সংক্রমণকে সারিয়ে তুলতে সক্ষম।

হারবাল রাইস প্যাক

DIY Homeopathic aromatherapy; Image source: Lil blue boo

এটা হচ্ছে অন্যতম সহজ পদ্ধতি। যখন আপনার বাচ্চা কানে ব্যথা অনুভব করবে তখন তার কানের বাইরের অংশে তাপ দিতে পারেন। আর তা জন্য হারবাল রাইস প্যাক হচ্ছে সবচেয়ে উপযুক্ত। এটি শুধু যে সস্তা তাই নয়, DIY এরোমাথেরাপি রাইস ব্যাগ তৈরি করাও সহজ।

প্রথমে হারবাল রাইস প্যাকটি মাইক্রোওয়েভ বা ওভেনে (অল্প তাপমাত্রায়) হালকা গরম করে নিন। স্পর্শ করলে গরম লাগলে সাথে সাথেই বের করে নিন। সংক্রমিত কানের উপর তা ধরে রাখুন ৫-১০ মিনিট, এভাবে ২-৩ বার করুন যতটুকু প্রয়োজন।
এই তাপটি শীতল এবং এটি কানের অংশটিতে হেলদি সার্কুলেশন বাড়ায় (Romm, 2000)।

হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ড্রপ

হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ড্রপ দিয়ে ইয়ারওয়াক্স বের করা যায়; Image source: Medical News Today

শরীরের নানারকম ক্ষত সারাতে বিশেষ করে বহিঃস্থ অংশের ক্ষতে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ব্যবহৃত হয়ে আসছে অনেক বছর ধরে। কানের সংক্রমণে পারঅক্সাইড ব্যবহার করতে চাইলে শুধুমাত্র আক্রান্ত কানের ভেতর কয়েক ফোঁটা হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড দিন।

২-৩ মিনিট অপেক্ষা করুন। তারপর মাথাকে কাত করে কান থেকে পারঅক্সাইড ফেলে দিন। এবার বিশুদ্ধ পানি দিয়ে কানটিকে আলতোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিন। দিনে ২-৩ বার এমনটি করুন।

এসেনশাল অয়েল ইয়ার ড্রপ

প্ল্যান্ট থেরাপি KidSafe Synergy Blend প্রদান করে যা Ear Ease নামে পরিচিত। এটি কতগুলো এসেনয়াল অয়েলের মিশ্রণ যার সাথে একটি ক্যারিয়ার অয়েলও থাকে এবং শরীরের কোনো প্রকার ক্ষত সারাতে এটি ব্যবহৃত হয়। সরাসরি কানের ভেতরে দিয়েও ক্ষতের চিকিৎসা হয়। যদি কানের পর্দায় ফুটা ছাড়া অন্যান্য সমস্যা থেকে থাকে তাহলে সামান্য পরিমাণে ব্যবহার করে ক্ষত সারিয়ে তুলা সম্ভব এসেনশাল তেলের মাধ্যমে।

পেঁয়াজের পুলটিস (প্রলেপ)

ঘরেই সহজেই তৈরি করতে পারবেন এটি; Image source: Wikihow

প্রাচীন সময় থেকেই বিভিন্ন ধরণের চিকিৎসায় যেমন সংক্রমণ, রক্তজমা এবং উষ্ণ টিস্যুর প্রতিকারের জন্য পেঁয়াজের পুলটিস ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পেঁয়াজ উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে এবং টিস্যুতে সার্কুলেশন বাড়িয়ে দেয়, প্রতিবন্ধকতা ভেঙ্গে দেয় এবং দেহকে উষ্ণ করে তুলে।

বুকে রক্ত জমে গেলে, কফ কমাতে, কিডনি বা ব্লাডার এরিয়ার ইনফেকশন প্রতিরোধেও এটি ব্যবহৃত হ্য। গলা ব্যথার সাথে কানের ব্যথা কমাতেও সক্ষম এই অনিয়ন পুলটিস। অনিয়ন পুলটিস বা পেঁয়াজের তৈরিকরণ প্রক্রিয়া সহজ। অনলাইনে তা দেখে নিতে পারেন।

হারবাল ইয়ার ড্রপ

কানের ব্যথা উপশমের জন্য হারবাল ইয়ার ড্রপও অনেক উপকারী। “Ear Owie” লিখে সার্চ দিলেই রেসিপিটি আপনি পেয়ে যাবে। দিনে কয়েকবার ব্যবহারেই কানের ব্যথা সেরে যাবে।

তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে কানে পুঁজ হয়ে গেলে বা কানের পর্দায় ছিদ্র দেখা গেলে আর দেরি করা যাবে না। তখন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া অত্যাবশ্যক।

Feature Image: Verywell Health