মানুষের মস্তিষ্ক অনেক বিচিত্র একটি বস্তু। এই অদ্ভুত অঙ্গটি যেসব রোগে আক্রান্ত হয় সেগুলোও আবার অনেক বিচিত্র। কাঠামোগত নানা রোগ ছাড়াও প্রায় সকল মানসিক রোগ সরাসরি মস্তিষ্কের সাথে জড়িত। এই রোগগুলোকে মূলত মেন্টাল ডিজঅর্ডার বলা হয়।

আমরা আসলে বিভিন্ন বাহ্যিক রোগ নিয়ে যতটা না চিন্তা করি, সে তুলনায় মানসিক রোগ নিয়ে আমরা একেবারেই উদাসীন। ছোটবেলায় অবহেলা করা একটা সামান্য মানসিক রোগ কিন্তু প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর অনেক দুর্ভোগ সৃষ্টি করতে পারে। এমনই একটি মানসিক রোগের নাম ডিজলেক্সিয়া

ডিজলেক্সিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি পড়তে ও লিখতে পারে না ; Source: msta.org

ডিজলেক্সিয়া আসলে কী?

ডিজলেক্সিয়া বলতে মূলত শিখতে না পারার অক্ষমতাকে বোঝায়। একেবারে ছোটবেলা থেকে, যখন কোনো শিশু ধীরে ধীরে পড়ালেখা শুরু করে, তখন থেকেই এর লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে থাকে। কোনো শিশুর ডিজলেক্সিয়া থাকলে সে কোনো কিছু লিখতে বা পড়তে পারে না। লেখা কিংবা পড়ার সময় সে অক্ষরগুলো ঠিকমতো চিনতে পারে না। বারবার অনুশীলন করলেও একসময় সে তালগোল পাকিয়ে ফেলে।


মা-বাবাও বুঝতে পারে না যে তাদের সন্তানের সমস্যাটা কোথায় ; Source: theconversation.com

অন্যান্য স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় সে খুব দেরিতে কোনো কিছুর মর্মার্থ বুঝতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে এগুলো বাচ্চার অমনোযোগিতার কারণ হিসেবে লক্ষণীয় হলেও ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মনে করুন, মা-বাবা তার ছয় বছরের সন্তানকে কয়েকটি শব্দ বারবার লেখার অনুশীলন করিয়েছে। তিন দিন পর যদি তাকে সেই শব্দগুলো লিখতে দেওয়া হয় তবে সে একদম কিছু পারবে না।

যে কবিতা সে কয়েকদিন ধরে বই থেকে পড়েছে, তার এক অক্ষরও উচ্চারণ করতে পারবে না। এগুলো তার কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো ভাষা মনে হবে। অপরদিকে আসল কারণ না জানায় বাবা-মা তার সন্তানকে অমনোযোগি বা দুষ্টু হিসেবে দোষারোপ করতে পারে। তাদের মোটেই ধারণা নেই যে, এটা তাদের সন্তানের কোনো ইচ্ছাস্বরূপ কাজ নয়। তার সন্তান আসলে ডিজলেক্সিক।

ডিজলেক্সিয়ার লক্ষণসমূহ:

ডিজলেক্সিয়ার লক্ষণ প্রকাশের তিনটি ধাপ রয়েছে। মূলত স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার আগে বাচ্চাদের মাঝে এই রোগটি দেখা যেতে পারে। তবে সঠিকভাবে শনাক্ত না করা হলে শিক্ষা জীবনে পা দেওয়ার পর অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

স্কুল পূর্ববর্তী সময়

১) সমবয়সী অন্যান্য বাচ্চাদের তুলনায় দেরিতে কথা বলতে শেখা। যদিও এর পেছনে অন্যান্য নানা কারণ থাকতে পারে।

২) বিভিন্ন শব্দ উচ্চারণ করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলা। যেমন – হেলিকপ্টারকে হেকিলপ্টার উচ্চারণ করা, টেডি বেয়ারকে বেডি টেয়ার উচ্চারণ করা ইত্যাদি।

৩) কথা বলার সময় সঠিক শব্দ খুঁজে না পাওয়া বা এলোমেলো শব্দ দিয়ে বাক্য তৈরি করা।

৪) নার্সারির ছড়া পড়তে গিয়ে অসুবিধায় পড়া। বিভিন্ন ছন্দের মিলগুলো উল্টাপাল্টা করে ফেলা।

৫) বর্ণমালা লেখা ও উচ্চারণের অনুশীলন করানোর সময় এক প্রকার অনীহা তৈরি হওয়া।


ডিজলেক্সিক শিশুর পড়তে বসার সময় প্রচুর অনীহা কাজ করে ; Source: melbournechildpsychology.com.au

স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর

ডিজলেক্সিয়ার চিহ্নগুলো প্রাথমিকভাবে স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরই ধরা পড়ে। মূলত শিক্ষকরাই কিছু লক্ষণ দেখে অভিভাবকদের এ বিষয়ে জানান।

১) কোনো অক্ষরের নাম ও উচ্চারণ মনে রাখতে অসুবিধা হওয়া।

২) একই শব্দের ভিন্ন ভিন্ন বানান তৈরি করা।

৩) অক্ষর লেখার সময় কিছু অদ্ভুত ভুল করে। যেমন – ইংরেজি “b” কে “d” l লেখা বা “d” কে “b” লেখা। পরস্পরের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে এমন অক্ষরগুলো ভুল করা। অনেকবার অনুশীলন করলেও একই লেখায় একটি অক্ষর ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ভুল করে লেখা।

৪) শব্দে বিভিন্ন বর্ণের সমাবেশ বুঝতে না পারা।

৫) কোনো প্রশ্নের উত্তর মুখে বলতে পারা কিন্তু লিখতে বা পড়তে দিলে অসহায় অনুভব করা।

৬) লেখা বা পড়ার সাথে জড়িত কাজগুলো অনেক দেরিতে শেষ করা।

কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে দৃশ্যমান লক্ষণ

ডিজলেক্সিয়া যে শুধু বাচ্চাদেরই থাকবে এমন কোনো কথা নয়। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এই ডিজঅর্ডার কিশোর কিংবা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও ব্যক্তির মাঝে টিকে থাকতে পারে। ডিজলেক্সিক শিশু শৈশব পার করলে তার মাঝে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়।

১) যেকোনো বিষয় সম্পর্কে বিষদ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও লেখার মাধ্যমে তা প্রকাশ করতে না পারা।

২) একই শব্দ অনেকবার অনুশীলন করলেও বানান মনে না থাকা।

৩) একেবারে সহজ অংকও করতে না পারা।

৪) কথা বলার সময় একটি নির্দিষ্ট শব্দ মনে করতে হিমশিম খাওয়া।

৫) সামান্য বিষয়ও মুখস্ত করতে না পারা।

৬) সুষ্ঠুভাবে কোনো কাজ বা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে না পারা।

মূলত ছোটবেলায় যত্নশীল না হলেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির মাঝে ডিজলেক্সিয়া থেকে যায়। তাই এ ব্যাপারে পরিবারকে যথেষ্ট যত্নশীল হতে হবে।


বলিউডে ডিজলেক্সিয়ায় আক্রান্ত এক বাচ্চাকে নিয়ে “তারে জামিন পার” চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে ; Source: download-wallpapersfree.blogspot.com

এই রোগের কারণ

ডিজলেক্সিয়া মূলত একটি লার্নিং ডিজঅর্ডার বা শিখনজনিত জটিলতা। এই রোগ হওয়ার পেছনে কোনো নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে কিছু বিষয়ের সাথে ডিজঅর্ডারটির যোগসূত্র রয়েছে। যেমন – বংশে অন্য কারো এই রোগ থাকলে বা পড়তে বা লিখতে পারে না সম্পর্কিত অন্য মানসিক জটিলতা থাকলে তা উত্তরাধিকার সূত্রে আরেকজন লাভ করতে পারে। বংশে অন্য কারো আগে কোনো শিখনজনিত জটিলতা থাকা এই রোগের মুখ্য কারণ।

এছাড়াও নির্ধারিত সময়ের পূর্বে জন্মগ্রহণ করলে বা নবজাতকের শরীরের ওজন তুলনামূলক কম হলে এই রোগ দেখা দিতে পারে। গর্ভকালীন সময়ে মায়ের শরীরে যদি নিকোটিন, মাদকদ্রব্য, অ্যালকোহল ইত্যাদি প্রবেশ করে এবং কোনো ইনফেকশন হয় তাহলে নবজাতকের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হয়। যার দরুণ ডিজলেক্সিয়া হতে পারে। এছাড়াও মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট যে অংশ পড়তে ও লিখতে সাহায্য করে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই রোগ দেখা দিতে পারে।

যেভাবে এই রোগের নিরাময় করতে হবে

যেহেতু রোগটি উঠতি বয়সী স্কুলগামী বাচ্চাদের মাঝে দেখা যায়, তাই প্রথমেই তাদের পড়াশোনার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। যদি এমনটি হয় যে, সন্তানের ঠিকভাবে কথা বলতে পারার বয়স হয়েছে, তবুও সে কথা বলতে পারে না, তখন থেকেই নজরদারিতে রাখতে হবে। অন্যান্য বাচ্চাদের তুলনায় দেরিতে কথা বলতে শেখা একটি পূর্বাভাস দিতে পারে। স্কুলে বাচ্চার পড়াশোনা কেমন চলছে, সে ঠিকমতো পড়তে বা লিখতে পারছে কিনা তা খেয়াল করতে হবে।

আসলে ডিজলেক্সিয়ার লক্ষণগুলো সুস্পষ্ট নয়। তাই মা-বাবা ও শিক্ষকদের এটি শনাক্ত করতে কিছুটা দুর্ভোগ ঠিকই পোহাতে হয়। যদি দেখেন যে, আপনার সন্তান লেখার সময় বারবার শুধরে দিলেও একটি অক্ষর একেক জায়গায় একেক রকম ভুল করছে, তাহলে আপনার সন্দেহ সত্যি হবে। যদি দেখেন সে কোনো ছড়া বা ছোটগল্প পড়ে শুনাতে গেলে খুবই অস্বচ্ছন্দ বোধ করছে বা একেবারেই পড়তে পারছে না, তাহলে আপনি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেন যে, আপনার সন্তানের ডিজলেক্সিয়া রয়েছে।


এই রোগ থেকে বাচ্চাকে বের করে আনা জন্য বাবা-মা ও শিক্ষকদের অনেক যত্নবান হতে হবে ; Source: understood.org

ডিজলেক্সিয়ার চিকিৎসা বলতে আসলে তেমন কিছু নেই। এই ডিজঅর্ডার থেকে বের হতে গেলে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। এজন্য একজন শিশুদের বিষয়ে দক্ষ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে আলাপ করতে হবে। ডিজলেক্সিক বাচ্চাকে অন্যান্য স্বাভাবিক বাচ্চাদের পর্যায়ে আনার জন্য প্রচলিত নিয়মের বাইরে যেয়ে পড়াশোনা করাতে হয়।

এ বিষিয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষকও রয়েছেন। তারা নানা ভাবে ভুগতে থাকা বাচ্চাটির সমস্যাগুলো শনাক্ত করে ধাপে ধাপে সেগুলো ঠিক করতে থাকেন। ডিজলেক্সিয়াতে ভোগা বাচ্চাগুলো অনেক অল্প বয়সেই প্রচন্ড হীনমন্যতা ও মানসিক যন্ত্রনায় ভুগতে থাকে। নিজেদের একঘরে করে রাখে। তাই পরিবার ও শিক্ষকদের যত্নবান হয়ে তাকে এই পর্যায় হতে বের করে আনতে হবে। অতিরিক্ত চাপ দিলে তা নিতান্ত এক বাচ্চার জন্য পাহাড়সম হয়ে দাঁড়ায়। তাই দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে তাকে এই রোগ থেকে বের করে আনার চেষ্টা করতে হবে।

প্রত্যেক বাচ্চাই স্পেশাল

সন্তানের ডিজলেক্সিয়া থাকলে বাবা-মার মন ভেঙ্গে পড়া ঠিক নয়। অন্য বাচ্চাদের থেকে সে একটু অন্যরকম হলে তা নিয়ে দুঃখ না করে বরং তাকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখা উচিত, ডিজলেক্সিয়া কোনো বুদ্ধিমত্তাজনিত রোগ নাই। এটি বলতে কেবল পড়তে ও লিখতে অক্ষমতাকে বোঝায়। এমন অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি রয়েছেন যারা ছোটবেলায় এই রোগে ভুগতেন। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আইন্সটাইন ছোটবেলায় ঠিকমতো কথা বলতে পারতেন না।


বিজ্ঞানী আইনস্টাইন প্রায় চার বছর মুখ দিয়ে কোনো শব্দ করেননি ; Source: wallsdesk.com

অক্ষর চিনে মনে রাখতে পারতেন না। কিন্তু এখন তাকে পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রোগীদের তালিকায় থাকা আরো একজন বিজ্ঞানী হলেন টমাস আলভা এডিসন। ইনিও ছোটবেলায় এই রোগের কারণে পড়তে ও লিখতে পারতেন না। এছাড়াও অন্যান্য পেশার মানুষদের মধ্যে রয়েছেন চিত্রকর পাবলো পিকাসো, পরিচালক স্টিভেন স্পিলবারগ, অভিনেতা টম ক্রুজ এবং আরো অনেকে। কাজেই নিষ্পাপ এই বাচ্চাগুলোকে দুর্বল না ভেবে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের সৃজনশীল মস্তিষ্ক তখন আশার আলো খুঁজে পাবে।