পরিচিতি:

নিউমোনিয়া হচ্ছে এক প্রকার শ্বাস সংক্রান্ত জটিলতা। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাল সংক্রমণের জন্য নিউমোনিয়া হয় যা ফুসফুসে জ্বালাভাব বা প্রদাহ ঘটায়। বিশেষ করে শিশু এবং বয়স্করা নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হয় বেশি অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাদের কম কিংবা তুলনামূলক যারা দুর্বল।

দীর্ঘদিন রোগে ভুগলেও নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে। তবে তরুণ, মধ্যবয়স্কদেরও এটি হতে পারে।
নিউমোনিয়া প্রতিরোধ্য এবং খুব মারাত্মক রোগ না হলেও প্রাথমিক অবস্থায় নিউমোনিয়াকে গুরুত্ব না দিলে পরিবর্তীকালে তা বড়সড় বিপদে পরিণত হতে পারে।

কারণ:

স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস; Image source: Murray brown labs

নিউমোক্কাস, স্ট্যাফাইলোক্কাস ইত্যাদি ব্যাকটেরিয়া, এন্টামিবা হিস্টোলাইটিকা, বিভিন্ন প্রকার ছত্রাক (মূলত যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের ছত্রাক দিয়ে হয়), বিভিন্ন ভাইরাস ইত্যাদি দ্বারা নিউমোনিয়া সৃষ্টি হয়।

এছাড়াও কেমিকেল, হঠাৎ ঠাণ্ডা পরিস্থিতিতে উন্মুক্ত হওয়া কিংবা অপারেশনের পরর্বতী সময়ে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থেকে যায়।

লক্ষণ ও উপসর্গ:

নিউমোনিয়ার উপসর্গগুলো ভিন্ন হয়ে থাকে। কী ধরনের জীবাণু নিউমোনিয়ার সংক্রমণ ঘটিয়েছে তার উপর শারীরিক অবস্থা নির্ভর করে।
নিউমোনিয়া হলে সাধারণত যে সব  লক্ষণ ও উপসর্গগুলো দেখা দেয় —

  • নিউমোনিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ হলো জ্বর। তার সঙ্গে কাশি।
  • কাঁপুনি হতে পারে।
  • শ্বাসকষ্ট থাকে। সংক্রমণ যত বাড়ে, শ্বাসকষ্টও বাড়তে থাকে।
  • বুকে ব্যথা হতে পারে। বুকের ব্যথার এই ধরন তবে একটু আলাদা। ব্যথা শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে উঠানামা করে। সাধারণত গভীর শ্বাস নেওয়ার সময়ে এই বুকের ব্যথা অনুভূত হবে। ফুসফুসের প্রদাহের কারণে এই ব্যথা হয়।
  • মাংসপেশিতে ব্যথা, মাথায় যন্ত্রণা।
  • ক্লান্তি লাগা। ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া
  • খাওয়ায় অনীহা, সারাক্ষণ বমি বমি ভাবও আনুষঙ্গিক লক্ষণের মধ্যে পড়ে।
  • বয়স্কদের ক্ষেত্রে ডিলিরিয়াম বা সংশয় হতে পারে।

নিউমোনিয়া হলে কাশি হয়; Image source: mayo life

শিশুদের নিউমোনিয়া প্রতিরোধে করনীয়:

বলা হয়ে থাকে অসুস্থ হওয়ার পরে চিকিৎসার চেয়ে তা প্রতিরোধে সতর্ক হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর নিউমোনিয়া প্রতিরোধে নিম্নলিখিত বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে-

  • পরিবারের সবাইকে অবশ্যই অভ্যাস করতে হবে সাবান দিয়ে দিনে কয়েকবার ভাল করে হাত ধোয়ার।
  • গর্ভকালীন সময়ে মায়েদের প্রয়োজনীয় পুষ্টিসহ যথাযথ যত্ন নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাদের যথাযথ যত্ন নিতে হবে যাতে অপরিণত বা স্বল্প ওজনের শিশুর জন্ম না হয়। কারন- অপরিণত বা স্বল্প ওজনের শিশুরা পরবর্তীতে খুব সহজেই নানান রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
  • শিশু যাতে অপুষ্টির শিকার না হয়, সেজন্য শিশুর জন্মের প্রথম ৬ মাস পর্যন্ত শিশুকে শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়াতে হবে।
  • ২ বছর বয়স পর্যন্ত অন্যান্য খাবারের পাশাপাশি মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যেতে হবে।
  • শিশুকে সময়মত সরকারিভাবে প্রদত্ত সবগুলো টিকা দিতে হবে।
  • কারও ঠাণ্ডা বা কাশি হলে অথবা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগী থেকে দূরে রাখতে হবে।
  • শিশুর থাকার জায়গা এবং বাড়ির পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
  • বাড়িতে আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
  • শিশুকে সিগারেট বা চুলার ধোঁয়া থেকে দূরে রাখতে হবে।

নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু; Image source: my.dr.com

বয়স্কদের ক্ষেত্রে:

নিয়মিত ভালো করে সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে। পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। শরীরের যত্ন নিতে হবে এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম গ্রহণ করতে হবে।ধূমপান বা যেকোনো মাদক বর্জন করতে হবে। অন্যের সামনে হাঁচি বা কাশি দেয়ার ক্ষেত্রে, অবশ্যই হাত বা রুমাল দিয়ে মুখ ঢাকতে হবে।

প্রতিকারের জন্য ঘরোয়া পদ্ধতি:

নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে তা যদি ঘোরতর পর্যায়ে চলে না যায় তাহলে আপনি ঘরে বসেই প্রাথমিক কিছু চিকিৎসা সেরে নিতে পারেন যা রোগ সারাতে ফলপ্রসূ হবে। এখানে নিউমোনিয়ার কয়েকটি প্রাকৃতিক নিরাময়ের উপায় সম্বন্ধে বলা হলো-

১) গোলমরিচ

গোলমরিচ; Image source: spice jungle

গোলমরিচে থাকে অধিক পরিমাণে ক্যাপসাইসিন। ক্যাপসাইসিন শ্বাসনালী ও শ্বসনতন্ত্র থেকে শ্লেষ্মা-কফ বেরোতে সাহায্য করে। এছাড়াও গোলমরিচ বিটা-ক্যারোটিনের উৎকৃষ্ট উৎস এবং এর জন্য মিউকাস মেমব্রেন সঠিকভাবে বৃদ্ধি পায় ও সুস্থ থাকে। 

পানির মধ্যে গোলমরিচ ও লেবুর রস মিশিয়ে সারাদিনে বার কয়েক খান। গাজরের রসের সাথেও গোলমরিচ যোগ করতে পারেন। উভয়েই কার্যকারিভাবে নিউমোনিয়ার নিরাময় করে।

২) রসুন

রসুনের উপকারিতা অনেক; Image source: organic facts

গবেষণায় দেখা গেছে রসুনের কিছু রাসায়নিক উপাদান যেমন অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল গুণ ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাসের মোকাবিলা করে। এটি শরীরের তাপমাত্রা কমায় এবং বেশী পরিমাণে শ্লেষ্মা বের করে দিয়ে বুক ও ফুসফুস থেকে কফ পরিষ্কার করে দেয়। 

তাই ঠাণ্ডা লাগলে বা ইনফ্লুয়েঞ্জা হলে রসুন খান। প্রতি বেলা খাবারে দুই-তিন কোয়া টাটকা রসুন খান। খেতে পারেন রসুনের সুপ। দুই তিন কোয়া রসুনের টাটকা কোয়া এবং কিছু টাটকা আদা কুচি দিয়ে দিন এক বাটি সবজির স্যুপে (গাজর, ব্রকলি, পালং শাক, টমেটো, বাঁধাকপি, লাল ও সবুজ মরিচ)। এতে পাবেন প্রচুর ভিটামিন এ ও সি যা রোগ প্রতিরোধক।

সুপের ভাপ নাক দিয়ে শুঁকলেও নাক বন্ধ সেরে যাবে। এরপর স্যুপ খান। অথবা রসুন থেঁতো করে নিয়ে গরম দুধ ও জলের সাথে মিশিয়ে খান কিংবা দিনে তিনবার লেবুর রস, মধু ও রসুনের মিশ্রণ খেয়ে সমস্যার সমাধান করুন। 

৩) হলুদ

হলুদ কাজ করে মিউকোলাইট হিসেবে শ্বাসনালি থেকে শ্লেষ্মা বের করে। এটির অ্যান্টিভাইরাল ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্য সংক্রমণের মোকাবিলা করে। গরম সরষের তেলের সাথে হলুদ গুঁড়োর পেস্ট বানিয়ে বুকে মালিশ করুণ। আপনি দিনে তিনবার এক গ্লাস গরম দুধের সাথে হলুদ গুঁড়ো মিশিয়েও খেতে পারেন।

৪) আদা চা:

আদা চা; Image source: Hindustan times

কফ সারাতে আদা চা বানিয়ে খেলে খুব উপকার দেয়। আর স্বাদু চা তৈরি করতে হলে এর সাথে যোগ করুন লেবুর রস ও মধু। আর যদি হজম ভালো করতে চান তাহলে টনিক হচ্ছে কমলালেবুর শুকনো খোসা, লবঙ্গ ও রোজমেরি সমান সমান পরিমাণে মিশিয়ে, এককাপ আদা-চায়ে এই মিশ্রণ এক চামচ মিশিয়ে ভিজিয়ে রাখুন ১০ মিনিট। এরপর পান করুন।

ঠাণ্ডা ও সর্দিতে আদা চা খুব ভালো। রক্ত চলাচল বাড়িয়ে ও ঘাম ঝরিয়ে ঠান্ডার কষ্ট কমায়।

৫) মেথির বীজ:

মেথির বীজে মিউকোলাইটিক গুণ থাকে যা কফ বের করে দেয়। এর জন্য ঘাম হয়, যা শরীর থেকে টক্সিন বের করে দেয় ও জ্বর কমে। দুইকাপ জলের মধ্যে মেথির বীজ গরম করে নিয়ে সেটা দিয়ে চা বানান। এই মিশ্রণ ছেঁকে নিয়ে খান। মেথির বীজ, আদা, রসুনের কোয়া ও একচিমটে গোলমরিচ দেওয়া হার্বাল চা খেতে পারেন। সমস্যার নিরাময়ের জন্য এটা সারাদিনে কিছুক্ষণ বাদে বাদে খান।

৫) তুলসী পাতা

ফুসফুসের জন্য তুলসীপাতার উপদান খুবই উপকারী। এটি নিউমোনিয়ার চিকিৎসায় সাহায্য করে।
কয়েকটা তুলসী পাতার নির্যাস বের করুণ। টাটকা গোলমরিচ গুঁড়ো করে একচিমটে মিশিয়ে প্রতি ছয়ঘণ্টা অন্তর খান।

তবে যে লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত তা হচ্ছে-

  • রোগীর জ্বর কমতেই চাইবে না।
  • শ্বাসকষ্ট বাড়বে। বুকে ব্যথা থাকবে। কাশির সাথে কফ উঠলে কফে অল্প রক্তও মিশে থাকতে পারে।
  • রোগী বেশি অস্বাভাবিক আচরণ করলে।

Feature Image: Children respiratory doctor