এবার যেন ডেঙ্গু জ্বর আবির্ভূত হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্নরূপে। প্রতিবছরই এই সময়টাতে ডেঙ্গু বা ডেঙ্গী ভাইরাস বাহক এডিস মশার প্রকোপ বেড়ে যায়, আক্রান্ত হতে থাকে মানুষজন। কিন্তু এই বছর বাড়তি কিছু ভিন্নতা ও জটিলতার সৃষ্টি করছে এই ডেঙ্গু।

পূর্বের যে লক্ষণগুলোর মাধ্যমে সহজেই বুঝা যেত ডেঙ্গু হয়েছে সেগুলো এখন অনেকটাই পরিবর্তিত এমনকি জনসাধারণের বুঝার অবকাশও থাকছে না সে নিজে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আছে কিনা। তার আগেই ঢলে পড়ছে মৃত্যুর কোলেও।

ডেঙ্গুরোগে আক্রান্ত হলে পূর্বের লক্ষণ ও বর্তমানের লক্ষণ নিয়ে জানবো আমরা তবে তার আগে এডিস মশা ও ডেঙ্গু ভাইরাস সম্পর্কে একটু জেনে নিই।

ডেঙ্গু ভাইরাস বা ডেঙ্গি ভাইরাস, ইংরেজিতে Dengue virus (DENV) একটি এক সূত্রক আরএনএ(RNA) ভাইরাস। এটি ফ্ল্যাভিভাইরিডি পরিবার ও ফ্ল্যাভিভাইরাস গণের অন্তর্ভুক্ত মশা দ্বারা বাহিত হয় এবং এটি ডেঙ্গু জ্বরের জন্য দায়ী। এই ভাইরাসের সেরোটাইপ পাওয়া গিয়েছে পাঁচটি। যাদের প্রত্যেকেই পূর্ণরূপে রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম।

এডিস ইজিপ্টি মশা (A. aegypti) এই ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক। জিকা ভাইরাস, ইয়েলো ফিভার ভাইরাস, চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের বাহকও একই মশা। বর্তমানে ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় এই রোগের বাহক এডিস মশা নিয়ে সবাই আরো কৌতূহলী হয়ে উঠেছে। এটি দেখতে কেমন, কখন কামড়ায়, কিভাবে কোথায় জন্মায়।

এডিস ইজিপ্টি মশা; Image source: Wikipedia

ডেঙ্গুর জীবাণু বহনকারী এডিস মশাকে খালি চোখে দেখে শনাক্ত করা সম্ভব। এই জাতীয় মশার দেহে সাদা কালো ডোরাকাটা দাগ থাকে, যে কারণে এটিকে টাইগার মশা হিসেবেও ডাকা হয়। আকারে এডিস মশা মাঝারি হয়ে থাকে। এটির অ্যান্টেনা বা শুঙ্গ দেখতে কিছুটা লোমশ হয়। পুরুষ মশার অ্যান্টেনা স্ত্রী মশার চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি লোমশ দেখতে হয়। দেহের ডোরাকাটা দাগ এবং অ্যান্টেনা দেখে এডিস মশা চেনা সম্ভব।

এডিস মশা শুধুমাত্র দিনের আলো থাকাকালীন সময়েই কামড়ায়। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এডিস মশা কামড়ায়। তবে কামড়ানোর হার সবচেয়ে বেশি থাকে সূর্যোদয়ের পর দুই-তিন ঘন্টা এবং সূর্যাস্তের আগের কয়েক ঘন্টা। রাতে এডিস মশা কামড়ায় না। অনেকে মনে করেন এডিস মশা শুধু মানুষের পায়েই কামড়ায়। কিন্তু এই দাবি ভিত্তিহীন।

শরীরের অনাবৃত অংশেই এডিস মশা কামড়ায়। সাধারণত শরীরে পা অনাবৃত থাকে বলে এতে মশা বেশি কামড়ায়।

ডেঙ্গুরোগের পরিচিত লক্ষণ:

  • জ্বর হওয়া (১০২-১০৫) ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত
  • গলা, হাত, পা, মাথা ও গিঁটে ব্যথা
  • গায়ে র‍্যাশ উঠা, চোখের পেছনে ব্যথা হওয়া
  • অতিরিক্ত পরিমাণে শারিরীক দুর্বলতা

ডেঙ্গুরোগের বর্তমান লক্ষণসমূহ:

  • গায়ে ম্যাজম্যাজে ভাব,
  • হালকা জ্বর, মাঝেমাঝে একদমই জ্বর থাকছে না
  • পেট ব্যথা, বদহজম, বমি হওয়া
  • ঠোঁটে ও গালে লালচে ফোস্কা
  • অস্থিরতা, খিচুনী হওয়া
  • প্রেসার দ্রুত কমে যাওয়া
  • হঠাৎ অচেতন হওয়া বা অচেতন ভাব হওয়া

ঢাকায় এবার আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি; Image source: Jugantor.com

জ্বরের সাথে যদি সর্দি- কাশি, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া কিংবা অন্য কোন বিষয় জড়িত থাকে তবে সেটি ডেঙ্গু না হয়ে অন্যকিছু হতে পারে। তবে জ্বর হলেই সচেতন থাকতে হবে।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এর প্রকোপ যে হারে বেড়েছে তা থেকে বাঁচার প্রধান শর্তই হচ্ছে সচেতনতা। একমাত্র সচেতনতাই পারে এডিস মশার আবাসস্থল ধ্বংসের মাধ্যমে ডেঙ্গুরোগের প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা করতে।

যেভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব:

  • এডিস মশা সাধারণত স্বচ্ছ পানিতে জন্মায় এবং ডিম পাড়ে। তাই বাড়িতে বা বাড়ির আশপাশে কোথাও কোনোভাবে পানি জমতে দেবেন না। টব, ভাঙা বাটি, নারকেলের মালা, এসির পানি, রাস্তার পাশে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত টায়ার, ছোট–বড় গর্ত ইত্যাদিতে পানি জমে সেখানে মশার উৎপাদন হতে পারে, তাই কোথাও যেন পানি তিন থেকে পাঁচদিনের বেশি জমা না থাকে তা খেয়াল রাখা আবশ্যক।
  • মশা যেন না কামড়ায় সে ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করুন। মশারি ব্যবহার করুন। প্রয়োজনে কিছুক্ষণ পরপর মশার ওষুধ স্প্রে করুন।
  • বাথরুমের বালতি বা অন্য কোনো পাত্রে পানি ধরে রাখা লাগলে তাতে ঢাকনা ব্যবহার করুন।

স্বচ্ছ পানিতে জন্ম নেওয়া এডিস মশার লার্ভা; Image source: inhabitat

ডেঙ্গু জ্বর মূলত দুই প্রকারের হয়। এর মধ্যে ক্লিনিক্যাল ডেঙ্গু মোটামুটি সহনশীল হলেও হেমোরেজিক ডেঙ্গু বা হেমোরেজিক ফিভার সবচেয়ে মারাত্মক। জ্বর হলেই তৎক্ষনাৎ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত শনাক্তকরণের জন্য।

তবে যে হাসপাতালে ভর্তি করতেই হবে তা নয়। ডেঙ্গুর চিকিৎসা বাড়িতেও সম্ভব, তবে রোগী বেশি দুর্বল ও পানিশূন্য হয়ে পড়লে বা শরীরের কোথাও রক্তবিন্দুর মতো দাগ, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, নাক বা মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার মতো যে কোনো লক্ষণে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে।

ডেঙ্গু আক্রান্তদের কারও পেটব্যথা বা ডায়রিয়া হলে সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে ভর্তি করানো উচিত। ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে দ্বিতীয়বার আক্রান্তরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাই সঙ্গে সঙ্গেই তাদের হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে চিকিৎসা দেয়া উচিত।

সম্প্রতি ধারণা করা হচ্ছে পেঁপে পাতার রস ডেঙ্গু নিরাময়ে কার্যকর; Image source: nkkho.com

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে করণীয়:

  • রোগী যত বেশি বিশ্রামে থাকবে, যত বেশি তরল খাবার খাবে, তত দ্রুত জ্বর নিয়ন্ত্রণে আসবে। তাই ডেঙ্গুর মূল চিকিৎসা প্রচুর তরল বা পানি গ্রহণ করা, পর্যাপ্ত বিশ্রামে থাকা।
  • যে কোনো জ্বরে ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপর তাপমাত্রা গেলেই তা কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে সাপোজিটর ব্যবহার করতে হবে। কিংবা রোগীর মাথায় জলপট্টি এবং কিছুক্ষণ পর পর ভেজা নরম কাপড় দিয়ে সারা গা মুছে দিতে হবে।
  • প্রচুর পানি, শরবত ও তরল খাবার বেশি দিতে হবে। কোনো অবস্থায়ই যেন শরীরে তরলের ঘাটতি না হয়।
  • জ্বর হলে প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ খাওয়া উচিত না। তবে যে কোনো জ্বর তিন দিনের বেশি থাকলে, শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই এতে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অন্য কোনো ব্যথার ওষুধ সেবন নয়। কেননা হেমোরেজিক ডেঙ্গু হলে কিছু ব্যথার ওষুধ রক্তক্ষরণ বাড়িয়ে বিপদ ঘটাতে পারে। তীব্র জ্বরের সঙ্গে শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, চোখব্যথা ইত্যাদি লক্ষণ থাকলে অবশ্যই বিশ্রাম নিতে হবে।
  • জ্বর কমে যাওয়ার পরের কিছু দিনকে বলা হয় ক্রিটিক্যাল পিরিয়ড। এ সময়টায় সবার সচেতন থাকা খুব জরুরি। নিয়মিত মশারী ব্যবহার এবং মশা নিরোধক স্প্রে ব্যবহার করতে হবে।

বাচ্চার ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করুন; Image source: jugantor.com

ডেঙ্গু নিয়ে ভয় পেলে চলবে না। বরং সচেতনতা এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে একে সারিয়ে তুলার চেষ্টা করতে হবে।

Feature Image: Hindustan times