চোখ হচ্ছে মানবদেহের আলোক-সংবেদী অঙ্গ যা আমাদেরকে দেখতে সাহায্য করে। চোখে অবস্থিত রড এবং কোণ কোষ রেটিনাতে আলো প্রবেশে সাহায্য করে, আলোর গভীরতা উপলব্ধি এবং নানারকম রঙের পার্থক্য বুঝার ক্ষমতা তৈরি করে। সাধারণত মানুষের চোখ প্রায় ১০ মিলিয়ন রঙ এবং একটিমাত্র ফোটনও সনাক্ত করতে সক্ষম। চোখ হচ্ছে সেন্সরি নার্ভাস সিস্টেমের একটি অংশ।

আমাদের জীবনে চোখের গুরুত্বের শেষ নেই। কেবল একজন অন্ধ মানুষই জানে চোখবিহীন পৃথিবী কি নিকষ কালো। তাই আমাদের উচিত চোখ নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা। অযত্নের কারণে চোখে বাসা বাঁধতে পারে বিভিন্ন রোগ, অপুষ্টি জনিত কারণে আমাদের মুল্যবান চোখ হয়ে উঠতে পারে কেবল অস্বস্তির কারণ।

সুস্থ চোখ; Image Source: proview eye care

তাই চলুন চোখের যত্নে কিছু করণীয় দেখে নিই। দেখে নিই কী কী করা উচিত, কী কী খাওয়া উচিত আমাদের গুরুত্বপূর্ণ এই অঙ্গটিকে সুস্থ সবল রাখতে:

খাদ্য তালিকা:

চোখের যত্নে খাবারে রাখতে হবে পুষ্টিসমৃদ্ধ এবং ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার। ভিটামিন এ, সি, ই, প্রোটিন, অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট, বিটা-ক্যারোটিন এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার চোখের ছানি পড়া, দৃষ্টিশক্তি কমে আসা, বয়সজনিত পেশী পতন এবং সূর্যালোক, বায়ু দূষণ ও সিগারেটের ধোঁয়ার মতো বিষয়গুলির ক্ষতি রোধ করতে সাহায্য করে।
চোখের স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে উপকারী কয়েকটি খাবার –

লেবুবর্গের ফল:

লেবুবর্গের ফল; Image Source: mix.com

লেবু, জাম্বুরা, কমলা ইত্যাদি ফলে থাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি। আর ভিটামিন সি চোখের ক্ষতি এবং চোখের বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমায়। তাই প্রতিদিন প্রত্যেকের খাবার তালিকায় ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ খাবার থাকা বাঞ্ছনীয়। দিনে একটি কমলা, আঙুর, লেবু ‍বা বাতাবি লেবু খাওয়াই যথেষ্ট।

তাছাড়া সকল প্রকার জামেও পাবেন প্রচুর পরিমান ভিটামিন সি। স্ট্রবেরি, ব্ল্যাকবেরি, ব্লুবেরি, কালো জাম, আম, পেপে ইত্যাদি ভিটামিন সি সমৃদ্ধ সুস্বাদু ফল।

সবুজ শাক সবজি:

শুধু যে চোখের জন্য তা নয়, দেহের যেকোনো অঙ্গের জন্যই সবুজ শাক সবজির গুরুত্ব অপরিসীম। শাক, ব্রুকলি, পাতা কপি, সবুজ শাক সবজি এমনকি ডাল ও অ্যাভোকাডোর ভেতর থাকা অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট চোখের ছানি ও ম্যাকুলার পতন রোধে দারুণ কার্যকরী। দৃশ্যমান আলো চোখের লেন্স ও রেটিনার ক্ষতি করে। 

সবুজ শাকসবজি; Image Source: CreativeMarket

সবুজ শাক সবজি সপ্তাহে এক বা দুইবার এবং কিউই ও আঙুর ফল খাদ্য তালিকায় যুক্ত থাকলে চোখের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয়।

সামুদ্রিক খাবার এবং মাছ:

চোখের সুস্থতার জন্য খেতে হবে প্রচুর ছোট মাছ রাখুন। কারণ এতে আছে চোখের প্রয়োজনীয় ওমেগা-৩। মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড ও চোখের সুস্বাস্থ্যে গুরুত্বপ‍ূর্ণ ভূমিকা পালন করে এই ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড।

সার্ডিন মাছ; Image Source: dissolve

স্যালমন, সারডিন, টোনা, হেরিং, রাঘববোয়াল মাছ এবং কাঁকড়া ও ঝিনুকে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাটি রয়েছে। সপ্তাহে দু’দিন এসব খাদ্য গ্রহণ করা উচিত। তাতে দৃষ্টিশক্তি ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য দুইয়ের জন্যই তা দারুণ কার্যকর হবে।

গাজর, রঙিন ফল ও সবজি:

গাজরে আছে প্রচুর পরিমাণে বিটা-ক্যারোটিন। চোখের স্বাস্থ্যের জন্য বিটা-ক্যারোটিন সমৃদ্ধ কমলা রঙের ফল সবচেয়ে উপকারী। এসব ফলে বিদ্যমান বিটা-ক্যারোটিন ভিটামিন ‘এ’ তে রূপান্তরিত হয়ে চোখের দৃষ্টি শক্তি কমে যাওয়া রোধে কাজ করে। গাজর ছাড়াও মিষ্টি আলু, কুমড়ো, লাউ জাতীয় সবজি, কমলা ও লাল মরিচেও বিটা-ক্যারোটিন রয়েছে।

শস্য, বীজ এবং বাদাম:

বাদাম ও বীজ ভিটামিন ‘ই’ এবং ওমেগা-৩ এর অন্যতম বড় উৎস। চোখের স্বাস্থ্যের জন্য ভিটামিন ‘ই’ এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড অত্যন্ত দরকারি। দৈনিক ভিটামির ‘ই’ এর চাহিদা পূরণে দুই মুঠো পরিমাণ কাজুবাদাম, আখরোট, সূর্যমুখী বীজ, পেস্তা বাদাম বা অন্য কোনো বাদাম খেতে হবে।

পরিমিত ঘুম:

রাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম হলে আমাদের শরীর-মন দুটোই সতেজ থাকে, কর্মক্ষেত্রেও ভালোভাবে কাজ করতে পারি। আমাদের চোখের জন্যও পর্যাপ্ত ঘুম খুব উপকারী। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের রাতে অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন।

ব্যায়াম:

শরীরের জন্য ব্যায়াম খুব জরুরী। চোখের উপকার সাধনেও ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ। ব্যায়াম করার ফলে চোখে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ে, তাতে চোখের বিষাক্ত পদার্থ বা টক্সিন দূর হয়।

সানগ্লাস ব্যবহার:

প্রচণ্ড রোদে সানগ্লাস ব্যবহার করুন; Image Source: cassidy optical

প্রখর রোদ থেকে চোখকে রক্ষা করা জরুরী। প্রচন্ড গরমে বাইরে বের হলে সানগ্লাস ব্যবহার করুন। তাতে ক্ষতিকর আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মি চোখের ক্ষতি করতে পারে না।

ধূমপান পরিহার:

ধূমপান তো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ই, ধূমপান চোখের জন্যেও ক্ষতিকর। বয়স বাড়ার সঙ্গে যে দৃষ্টিশক্তিহীনতা সৃষ্টি হয়, তার জন্য ধূমপানকে দায়ী করা হয়।

বিশেষ টিপস:

১) নিয়মিত চোখ পিটপিট করা চোখের স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো। চোখ পরিষ্কার রাখুন আর প্রতি তিন-চার সেকেন্ডে একবার চোখের পাতা বন্ধ ও খোলার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

২) চোখকে আরাম দিন। যেমন দুই হাতের তালু ঘষে তাপ উৎপন্ন করে তা দুই চোখে ধরুন। এতে চোখ জ্বলা কমে যাবে এবং আরাম বোধ করবেন।

৩) আমরা সাধারণত কাছের বস্তুতে দৃষ্টি দিতে অভ্যস্ত। দূরে দৃষ্টি দিন। হাঁটতে বা বসে দূরে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করুন।

৪) সূর্যের আলো চোখের ফ্রি চিকিৎসা দেয়। তবে প্রখর রোদ নয়। খুব সকালের এবং শেষ বিকেলের আলো চোখের যত্ন নেয়।

৫) অনেকে চোখে ঝাপসা দেখেন। পানির ঝাপটা নিয়ে এ থেকে মুক্তি মিলতে পারে। শুষ্ক অবস্থার কারণে সাধারণত এমনটা ঘটে।

৬) কম্পিউটার, স্মার্টফোন ও টেলিভিশনের উজ্জ্বলতা কমিয়ে রাখুন। এবং দীর্ঘক্ষণ ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।

৭) সুযোগ পেলেই চোখে পানি দিন। মুখ ধোয়ার সময় চোখে বেশি বেশি পানি দিন। এতে চোখের ধুলো পরিষ্কার হবে।

৮) চোখে মেকআপ ব্যবহার থেকে দূরে থাকুন। যদি নিয়েই থাকেন তবে যত দ্রুত সম্ভব ধুয়ে ফেলুন।

৯) কাজের ফাঁকে একটু বিরতি নিন। চোখ যখন কাজ করতে করতে ক্লান্ত, তখন একটু ম্যাসাজে উপকার মেলে। বিশেষ করে মাথায় হালকা ম্যাসাজ করলে ভালো বোধ করবেন। ঘুমের অভাবে মাথা ও চোখে ব্যথা হয়। ঘুমালেই চোখ শান্তি পাবে।

১০) চোখের সমস্যা নিয়মিত হলে নিয়মিত বিশেষজ্ঞের কাছে চোখ দেখান।