হাড় ভেঙ্গে গেলে কী কী করতে হবে তা সম্পর্কে জানার আগে আগে জেনে নিই হাড় বলতে আসলে কী বুঝি?

হাড়কে আমরা অস্থি নামেও চিনি। এটি প্রাণীর শরীরে অন্তঃকঙ্কালগঠনকারী এক ধরনের কঠিন অঙ্গ। এক ধরনের কঠিন যোজক কলা দিয়ে হাড় গঠিত। হাড় শক্ত কিন্তু হালকা। দেহের অবস্থানভেদে হাড়ের আকার, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক গঠনও বিভিন্ন।

হাড় প্রধানত অস্থি কলা দিয়ে গঠিত যা হাড়কে দেয় কাঠিন্য এবং এটি অভ্যন্তরে থাকে প্রবালের মত ত্রিমাত্রিক ফাঁপা গঠনের মতো। এটিতে মূলত ক্যালসিয়াম ও ফসফেট থাকে। অস্থি কলার পাশাপাশি হাড়ের মধ্যে অস্থি মজ্জা, তরুণাস্থি, রক্তনালিকা, স্নায়ু প্রভৃতির কলা বিদ্যমান থাকে।

একটি সদ্যোজাত মানবশিশুর শরীরে মোট ২৭০টিরও বেশি হাড় থাকলেও তার বৃদ্ধির সাথে সাথে কিছু হাড় জোড়া লেগে একক হাড়ে পরিণত হয়। ফলে পরবর্তীতে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের শরীরে মোট হাড়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ২০৬টিতে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় হাড়ের নাম ফিমার এবং সবচেয়ে ছোটোটি হচ্ছে স্টেপিস যা কানের ভেতরে অবস্থিত।

এক্স-রে তে যেমন দেখায়: Image source: Orthoatlanta

আমাদের দেহের বিভিন্ন কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণে হাড়ের গুরুত্ব অপরিসীম। শরীরের কাঠামো সৃষ্টি তো আছেই, গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসমূহ রক্ষা করা, লোহিত ও শ্বেত রক্তকণিকা সৃষ্টি এবং খনিজ পদার্থ সংরক্ষণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেহের ভারবহন করা, দেহের নির্দিষ্ট আকৃতি বজায় রাখা, রক্তকণিকা তৈরী করা, দেহের নরম ও নাজুক অংশকে (ফুসফুস , হৃৎপিন্ড ইত্যাদি) বাইরের যেকোনো আঘাত থেকে সুরক্ষিত রাখা এবং চলনে সহায়তা করে হাড়।

হাড়, জোড়া ও মাংসপেশি ইত্যাদি মিলে পূর্ণাঙ্গ মানবদেহ গঠিত হয়। হাড় ও জোড়াগুলো একটি নির্দিষ্ট দিকে ও নির্দিষ্ট নিয়মে নড়াচড়া করতে পারে। এই নির্দিষ্ট নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটলেই হাড় ভেঙ্গে যেতে পারে।

হাড় ভাঙ্গে কেন?

দুর্ঘটনার কারণে ওপেন ফ্রাকচার; Image source: verywell

নানা কারণে হাড় ভাঙ্গতে পারে। সাধারণত বড় ধরনের আঘাতের কারণে হাড় ভেঙ্গে যেতে পারে। গাছ থেকে পড়ে গিয়ে, আছাড় খেয়ে পড়ে গেলে, রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটলে, মারামারি ফলে, হাড়ের মধ্যে ক্যালসিয়ামের বা ফসফেটের পরিমাণ কমে গেলে, কিংবা অস্টিওপরোসিস বা বোন ক্যান্সারের মতো কিছু রোগের কারণেও হাড় ভেঙ্গে যেতে পারে।

হাড় ভাঙ্গার প্রকারভেদ:

হাড় ভাঙ্গার ধরণের উপর ভিত্তি করে একে সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা :

১) ওপেন ফ্রাকচার: এই ক্ষেত্রে ভেঙ্গে যাওয়া হাড়টি চামড়া ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসে, ফলে এই ধরণের ফ্রাকচারে রক্তপাত হবেই।

হাড় ভাঙ্গার প্রকারভেদ: Image source: Dr. Vivek saini

২) ক্লোজড ফ্রাকচার: এই ক্ষেত্রে হাড় ভেঙ্গে গেলেও তা ভেতরে থেকে যায়, চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসে না। ফলে রক্ত বের হয় না। কখনো কখনো হাড় ভেঙ্গে গুড়া অংশে বিভক্ত হয়ে জটিল আকার ধারণ করে।

হাড় ভেঙ্গেছে কিনা যেভাবে বুঝবেন:

হাড় ভেঙ্গে গেলে কিছু লক্ষণ বা উপসর্গের মধ্যে দিয়ে আপনি তা বুঝতে পারেন। যেমন-

  • আক্রান্ত স্থানে প্রচণ্ড ব্যথা হওয়া
  • স্থানটি ফুলে যাওয়া
  • ভেঙ্গে যাওয়া স্থান লাল হওয়া
  • অঙ্গটির স্বাভাবিক অবস্থা নষ্ট হয়ে যাওয়া
  • স্থানটিতে স্পর্শ করলে খুব ব্যথা অনুভব হওয়া
  • ভাঙ্গা অংশটি নাড়ালে এক ধরনের শব্দ অনুভূত হতে পারে
  • রক্ত বের হওয়া, এমনকি রক্ত বের হওয়ার জন্য রোগী জ্ঞান হারাতে পারেন।

হাড় ভেঙ্গে গেলে প্রাথমিকভাবে করণীয়:

Open Fracture-এর ক্ষেত্রে রক্তপাত হয়। ফলে রোগীর রক্ত বন্ধ করা জরুরি হয়ে পড়ে। তার জন্য

  • ভাঙ্গা স্থানে ঠাণ্ডা বা বরফ দিন।
  • ভাঙ্গা অংশের ওপরের দিক একটি রশি দিয়ে বেঁধে দিতে হবে এবং ভাঙ্গা অংশ সুন্দরভাবে আবৃত করে বেঁধে দিতে হবে। 
  • খুব তাড়াতাড়ি হাসপাতাল বা নার্সিং হোমে নিয়ে যান। ক্ষতস্থানে স্টেরাইল গজ এবং নীচে প্যাডিং করা কাঠের পাটাতন বা অন্তত কাঠের স্কেল রেখে হালকা করে ব্যান্ডেজ জড়িয়ে দিন।
  • না দেওয়া থাকলে ঘা পরিষ্কার করে অ্যান্টিটিটেনাস ইনজেকশন দেওয়া হয়। অ্যান্টিবায়োটিক শুরু হয়।বাইরে থেকে রড ঢুকিয়ে হাড় সেট করা হয়।
  • এক্সটারনাল ফিক্সেশন থাকে ৪ – ১২ সপ্তাহ। ঘা শুকিয়ে গেলে এক্সটারনাল ফিক্সেটর খুলে হয় প্লাস্টার করা হয়, নয়তো অপারেশন করে ইনটারলকিং নেল বা প্লেট-স্ক্রু দিয়ে হাড় জোড়া হয়।
  • অবস্থা জটিল হলে বহু দিন হাসপাতালে থাকতে হয়।
  • ওপেন ফ্র্যাকচারে নানা রকম জটিলতা হতে পারে। হাড়ে জীবাণু সংক্রমণ, হাড় না জোড়া। তখন আবার বিশেষ ধরনের ফিক্সেশন (ইলিজারব) করতে হতে পারে।

ক্লোজ ফ্র‍্যাকচার হলে রক্তপাত হয় না কিন্তু ব্যথা হবে প্রচণ্ড; Image source: Healthline

যদি Close Fracture হয়, অর্থাৎ রক্ত যদি বের না হয় তবে কিছু ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। এই ক্ষেত্রে RICEN থেরাপি বহুল প্রচলিত। যার মানে হলো

  • R=Rest আক্রান্ত স্থানটিকে বিশ্রামে রাখতে হবে।
  • I=Ice therapy বা বরফ লাগাতে হবে
  • C=crape bandage দিয়ে নড়াচড়া বন্ধ করানো।
  • E= Elevation অর্থাৎ আক্রান্ত অঙ্গটি একটু উঁচুতে রাখতে হবে। যাতে অঙ্গটি হৃৎপিণ্ড থেকে ওপরে থাকে।
  • N= NSAID অর্থাৎ বেদনানাশক ওষুধ দিতে হবে।
  • এরপর দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। তিনি রোগীর অবস্থা অনুযায়ী প্লাস্টার করবেন বা প্রয়োজনীয় ওষুধ দেবেন।

প্লাস্টার খোলার পর বা অপারেশন করার পর করণীয়:

  • প্লাস্টার খোলার পর প্রথমত দেখতে হবে ভাঙ্গা হাড় ঠিকমতো জোড়া লেগেছে কি না। জোড়া না লাগলে সংশ্লিষ্ট ডাক্তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
  • জোড়া লাগলে দেখতে হবে কোনো মাংসপেশি শুকিয়েছে কি না। শুকিয়ে গেলে ওই মাংসপেশির জন্য নির্ধারিত ব্যায়াম করতে হবে। 
  • কোনো জোড়া শক্ত হলে তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যায়াম ও ফিজিক্যাল থেরাপি গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য একজন ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। নতুবা রোগী পঙ্গু হতে পারে।

আক্রান্ত স্থান উচুঁ করে রাখতে হবে; Image source: Healthline

  • হাত বা পায়ের ক্ষেত্রে কুসুম গরম পানিতে লবন মিশিয়ে তাতে আক্রান্ত স্থান ভিজিয়ে রাখতে হবে।
  • প্লাস্টার করার পর আক্রান্ত অঙ্গ সাধারণত ফুলে যায়। এই ফোলা কমানোর জন্য অঙ্গকে একটু উঁচুতে রাখতে হবে।
  • প্লাস্টার করা অংশের ওপরের জোড়া ও নিচের জোড়াকে রোগী নিজে নিজে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নাড়াবেন বা প্রয়োজনীয় ব্যায়াম করবেন। এতে ফোলা কমে যাবে এবং রক্ত চলাচল বেড়ে যাবে।
  • হাত ও পায়ের যেকোনো হাড় ভেঙ্গে গেলে এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া খুবই জরুরি।

Feature Image: Healthline