কিটোজেনিক ডায়েট পদ্ধতিতে প্রতিদিনের খাবার রুটিনে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ অনেকটা কমানো হয় আর ফ্যাটের পরিমাণ বাড়ানো হয়। অতিরিক্ত ফ্যাট থেকে তৈরি হয় কিটোন যা শরীরে বিপাকের হার বাড়িয়ে দেয় যাকে বলা হয় মেটাবলিক স্টেট বা কিটোসিস।

কিটোজেনিক ডায়েট, Source: Lurie Children’s Blog

এর ফলে একদিকে শরীরে প্রচুর ক্যালরি উৎপন্ন হয় আবার কিটোনের কারণে সেই ক্যালরি ব্যয়ও হয় খুব সহজে। এই অতিরিক্ত ফ্যাট গ্রহণ করলেও শরীরে বাড়তি ফ্যাট জমতে পারে না। আর তাই কিটোজেনিক ডায়েট ওজন কমাতে সহায়ক।

শুধু ওজন কমাতে নয়, কিটোজেনিক ডায়েটের আরও অনেক উপকারিতা রয়েছে। কিন্তু একইসাথে এর অনেক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। সুতরাং আপনি কিটোজেনিক ডায়েট গ্রহণ করবেন কিনা তা ঠিক করার আগে জেনে নিন এর সুবিধা ও অসুবিধা।

কিটোজেনিক ডায়েটের সুবিধা

কিটোজেনিক ডায়েটে অতিরিক্ত মাত্রায় ফ্যাট গ্রহণ করা হয় বলে প্রথম দর্শনে একে অস্বাস্থ্যকর ডায়েট মনে হলেও এর রয়েছে ওজন কমানো সহ নানাবিধ উপকারিতা। যেমন

শরীরের ওজন কমাতে

কিটোজেনিক ডায়েট কোনো রোগ বালাই ছাড়াই শরীরের ওজন কমাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। অন্যান্য অধিকাংশ ডায়েটে যেমন রোজা ইত্যাদিতে শারীরিক দুর্বলতা, রক্তচাপ কমে যাওয়া সহ নানা শারীরিক রোগ দেখা যায় বলে অনেকেই ওজন কমানো নিয়ে চিন্তিত থাকেন। কিন্তু কিটো ডায়েটে অতিরিক্ত ফ্যাট গ্রহণ করা হয় যা শরীরে প্রয়োজনীয় ক্যালরি প্রদান করে ফলে দুর্বলতার কোনো আশংকা থাকে না।

কিটোজেনিক ডায়েট ওজন কমায়, Source:samacharnama.com

বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে যে, ওজন কমানোর ক্ষেত্রে অন্যান্য লো-ফ্যাট ডায়েটের চেয়ে হাই ফ্যাট কিটোজেনিক ডায়েটের কার্যকারিতা আড়াই থেকে তিনগুণ বেশি।

এর একটি কারণ হলো ফ্যাট থেকে অতিরিক্ত মাত্রায় উৎপন্ন কিটোন ইনসুলিন হরমোনকে আরও সক্রিয় করে তোলে। ফলে রক্তের চিনি গ্লুকোজে পরিণত হয়ে কোষ কর্তৃক শোষিত হয়ে যায়। এতে কোষে শক্তি বৃদ্ধি পায় আবার রক্তে চিনির পরিমাণ কমে যায় বলে ওজন বৃদ্ধির আশংকা থাকে না। আরেকটি কারণ হলো হাই ফ্যাট হজম হতে বেশি সময় লাগে বলে ঘন ঘন ক্ষুধাও লাগে না। এর ফলে ক্যালরি ব্যয় হওয়ার সুযোগ পায় বলে ওজন বৃদ্ধি পায় না।

ডায়াবেটিস রোগীদের ব্লাড সুগার কমাতে

ব্লাড সুগার পরীক্ষা, Source: banglanews24.com

কিটো ডায়েটের অতিরিক্ত কিটোন ইনসুলিন হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে রক্তের চিনি কমাতে সাহায্য করে। গবেষণা থেকেও জানা গিয়েছে যে, টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য শুধুমাত্র সঠিক কিটোজেনিক ডায়েট মেনে চললেই ওষুধ ছাড়াই সুস্থ জীবন যাপন করা সহজ হতে পারে।

হৃদরোগ কমাতে

কিটোজেনিক ডায়েট শরীরে ফ্যাট জমতে দেয় না এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। ফলে হৃৎপিণ্ড সুস্থ থাকে।

ক্যান্সার রোগে

এই ডায়েট ক্যান্সার কোষের দ্রুত বৃদ্ধি রোধ করে। ফলে ক্যান্সার রোগীদেরকে এই ডায়েটে উৎসাহিত করা হয়ে থাকে।

ব্রণের সমস্যা দূর করতে

কিটো ডায়েটে অল্প চিনি খেতে বলা হয় এবং সব খাবার রান্না করে খেতে বলা হয়। ফলে ব্রণের সমস্যা কম হয়।

কিটোজেনিক ডায়েটের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

কিটোজেনিক ডায়েট গ্রহণ করলে শুরুর দিকে সাধারণ কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। যেমন

কিটো ফ্লু

হঠাৎ করে কিটো ডায়েট শুরু করলে কিটো ফ্লু দেখা দিতে পারে। এর ফলে শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতা, ক্ষুধা বৃদ্ধি, ঘুম না হওয়া বা আগের চেয়ে বেশি হওয়া, বমি ভাব, হজমে সমস্যা, ব্যায়াম করতে সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি দেখা দিতে পারে।

কিটো ফ্লু, Source: Diet Doctor

তাই সম্পূর্ণভাবে কিটো ডায়েট শুরু করার আগে শরীরকে এর জন্য প্রস্তুত করে নিতে হবে। কিটো ডায়েট শুরু করার আগে কিছুদিন ধীরে ধীরে খাবারে ফ্যাটের পরিমাণ বাড়াতে হবে এবং কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কমাতে হবে।

পানি ও লবণের ভারসাম্যহীনতা

এছাড়াও হঠাৎ কিটো ডায়েট শুরু করলে শরীরে পানি ও মিনারেলের ভারসাম্য কমে যেতে পারে। ফলে রক্তচাপের কম বেশি হতে পারে। এতে অতিরিক্ত লবণ খাওয়া কিংবা লবণ বাদ দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

হজমে সমস্যা


কিটো ডায়েটে হজমের সমস্যা, Source: janatatimes.com

অতিরিক্ত ফ্যাট গ্রহণের ফলে কিটো ডায়েটে হজমের সমস্যা হতে পারে। কারও কারও কোষ্ঠকাঠিন্য হয়ে থাকে। তখন ফাইবার জাতীয় সবজি বেশি করে খেতে হবে। ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্টও ওষুধ হিসেবে খাওয়া যেতে পারে। অনেকের আবার ডায়রিয়াও হতে দেখা যায়। এমন হলে স্যালাইন ও ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। তবে ২-৩ সপ্তাহ ধরে কিটো ডায়েট চার্ট মেনে চললে ধীরে ধীরে তা শরীরের সাথে মানিয়ে যায় এবং পরে আর কোনো সমস্যা হয় না।

দুর্গন্ধযুক্ত নিশ্বাস ও প্রস্রাব

প্রচুর ফ্যাট, প্রোটিন ও ফলমূল গ্রহণ করার কারণে বাই প্রোডাক্ট হিসেবে যে রাসায়নিক পদার্থ উৎপন্ন হয় তা প্রস্রাবের সাথে বের হয়ে যায়। এর কারণে প্রস্রাবে দুর্গন্ধ হতে পারে। এমনকি নিঃশ্বাসের সাথেও দুর্গন্ধ আসতে পারে। মাউথওয়াশ ব্যবহার করলে নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধ দূর করা যায়।

কিটোজেনিক ডায়েটে সামান্য কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া থাকলেও এর সুবিধাই বেশি। কিন্তু এর আগে এটি আপনার জন্য উপযোগী কিনা কিংবা আপনার লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক কিনা তা অবশ্যই যাচাই করে নিতে হবে।

মনে রাখবেন, কিটোজেনিক ডায়েট ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য এবং যারা অতিরিক্ত মোটা ও ওজন কমাতে চান তাদের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী ডায়েট। কিন্তু আপনি যদি খেলোয়াড় বা বডি বিল্ডার হতে চান তবে এই ডায়েট আপনার জন্য নয়। আবার অন্যান্য ডায়েটের মতো কিটোজেনিক ডায়েট থেকেও উপকারিতা পেতে হলে কঠোরভাবে এর নিয়মগুলো নিয়মিত মেনে চলতে হবে।

Featured Image: Diet Doctor