পরিচিতি:

কলা বিশ্বব্যাপী বহুল পরিচিত এবং পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ একটি ফল। পর্যাপ্ত মিষ্টি হওয়ায় স্বাদেও চমৎকার।

কলাগাছ Musaceae পরিবারের একটি উদ্ভিদ। যার গণ দুইটি। Ensete ও Musa। Musa গণের আছে প্রায় ৪০টি প্রজাতি। এর অধিকাংশ প্রজাতির উৎপত্তি দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায়। আমাদের দেশে সাধারণত যে কলাগুলো পাওয়া যায় বীজের উপর ভিত্তি করে তাদেরকে ৪ ভাগে ভাগ করা যায়।
যেমন –

সম্পূর্ণ বীজমুক্ত কলা: সবরি, অমৃতসাগর, অগ্নিশ্বর, দুধসর, দুধসাগর প্রভৃতি ।

দু-একটি বীজযুক্ত কলা: চাম্পা, চিনিচাম্পা, কবরী, চন্দন কবরী, জাবকাঠালী ইত্যাদি ।

বীজযুক্ত কলা: এটেকলা যেমন-বতুর আইটা, গোমা, সাংগী আইটা ইত্যাদি ।

আনাজী কলা: ভেড়ার ভোগ, চোয়াল পউশ, বর ভাগনে, বেহুলা, মন্দিরা, বিয়েরবাতি প্রভৃতি।

কলা বগান; Image source: the daily meal

পুষ্টিগুণ:

প্রতিদিন কমপক্ষে একটি করে কলা খাওয়ার উপকারিতা অনেক। পাকা কলা পটাশিয়ামের আধার।

প্রতি ১০০ গ্রাম পরিমাণ কলায় আছে ১১৬ ক্যালোরি। ক্যালসিয়াম ৮৫ মি.গ্রা., আয়রন ০.৬ মি.গ্রা. অল্প পরিমাণে ভিটামিন সি, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স (বি৬, বি১২) ৮ মি.গ্রা., ফসফরাস ৫০ মি.গ্রা., পানি ৭০.১%, প্রোটিন ১.২%, ফ্যাট/চর্বি ০.৩%, খনিজ লবণ ০.৮%, আঁশ ০.৪%, এবং শর্করা ৭.২%।

কলায় ট্রিপটোফেন নামে এক ধরনের প্রোটিন আছে। এই প্রোটিন শরীরে সেরোটোনিন নামের হরমোন তৈরি করে, যা মনকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে। আছে ভিটামিন ই৬ । কলায় প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া আছে, যা শরীরকে ক্যালসিয়াম শোষণ করতে সাহায্য করে।

চম্পা কলা; Image source: Chahida.com

দেহের উপকারে কলা:

কলায় প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম থাকায় কলা খাওয়া মানেই দেহে পটাশিয়ামের যোগান দেয়া। আর দেহে পটাশিয়ামের মাত্রা বাড়তে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই শরীরের কর্মক্ষমতা বাড়তে শুরু করে। ফলে এটি দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি করে। তাই চেষ্টা করুন প্রতিদিন একটি থেকে দুইটি কলা খেতে। একজন স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ কলা খেতে কখনোই পিছপা হন না।

আসুন জেনে নেওয়া যাক কলার যত গুণ:-

১) ত্বকের যত্নে:

কলা খাওয়ার পর যদি কলার খোসা মুখে লাগাতে পারেন, তাহলে একাদিক যেমন ত্বকের রোগের প্রকোপ কমে, তেমনি স্কিনের হারিয়ে যাওয়া ঔজ্জ্বল্য ফিরে আসে। আসলে কলার খোসার অন্দরে থাকা একাধিক উপাকারি উপাদান এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

প্রসঙ্গত, কলার খোসায় থাকা উপকারি ফ্যাটি অ্যাসিডও এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। মশার কামড়ে ফুলে, লাল হয়ে ওঠা ত্বকের যত্ন নিতে ক্রিম বা অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার করার আগে কলার খোসা ঘষে দেখুন ত্বকের ফুলে ওঠা অংশে।

ত্বক ও চুলের যত্নে কলা ও মধু; Image source: furilia

২) রক্তস্বল্পতা রোধে:

কলার মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন রয়েছে। আয়রন রক্তকণিকা ও হিমোগ্লোবিন তৈরিতে কাজ করে। রক্তস্বল্পতা সৃষ্টি হয় আয়রনের ঘাটতিতে। তাই যারা রক্তশূন্যতায় ভুগছেন নিয়মিত এক মাস যদি দিনে দুটি করে কলা খান তাহলে রক্তের ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হয়ে যাবে

৩) মন ভালো রাখতে:

কলা মন ভালো করে দিতে সাহায্য করে এবং কমায় বিষন্নতা। কলায় আছে ট্রিপটোফেন আছে যা পরবর্তীতে সেরোটনিনে রূপান্তরিত হয়ে মন ভালো করে দিতে সাহায্য করে।
আর প্রতিদিন দুটি কলা খাওয়া এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। কলার মধ্যে থাকা উপাদান মস্তিষ্কে সুখানুভুতির হরমোনের নিঃসরণ বাড়ায়। তাই বিষণ্ণতায় ভুগলে দিনে দুটি করে কলা খান।

৪) কোষ্ঠকাঠিন্য রোধে:

কলা হজমে সাহায্য করে। কারণ কলার মধ্যে রয়েছে আঁশ। এবং এটি এন্টিসিডের মতও কাজ করে। কলা নরম ও মিহি হওয়ায় এটি পেটের অস্বস্তি কমায়। দিনে দুটি কলা খেলে তা পাকস্থলীতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি রোধ করতে সহায়তা করে এবং হজমের সাহায্য করে। বিশেষ করে কমে কোষ্ঠকাঠিন্য, হয় পেট ফাঁপা সমস্যার সমাধান। কলা পাকস্থলীতে ক্ষতিকর এসিড রোধ করে বুক জ্বালা পোড়াও কমায়।

৫) স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে:

কলার মধ্যে থাকা পটাশিয়াম মস্তিষ্কের কার্যক্রম বাড়ায় এবং স্মৃতিশক্তি ভালো রাখে। গবেষকদের মতে, যেসব ছাত্র সকালের নাশতায় বা বিকেলের নাশতায় কলা খায়, তাদের মনোযোগ বাড়ে বহুগুণে।

৬) ওজন কমাতে:

ওজন কমাতে ডায়েট চার্টে কলা রাখুন; Image source: weight senital

কলার শরীরে পটাশিয়াম ছাড়াও রয়েছে প্রচুর মাত্রায় ফাইবার, যা অনেকক্ষণ পেট ভরিয়ে রাখে। ফলে খাওয়ার পরিমাণ কমতে শুরু করে। আর কম খেলে যে ওজনও কমে, সে কথা কার না আজানা বলুন!

৭) দাঁতের যত্নে:

কলা দাঁতের উপকারও করে। আপনি যদি প্রায় দুই মিনিট ধরে কলার খোসা দাঁতের উপর ঘষেন তাহলে এটি দাঁতের উপরে থাকা ময়লা ও দাগ দূর করে দাঁতকে সাদা করে তুলবে। মিনারেলে ভরপুর কলার খোসা দাঁতকে সাদা ঝকঝকে করে তুলতে পারে।

৮) রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে:

কলায় কম সোডিয়াম রয়েছে। তবে রয়েছে উচ্চ মাত্রায় পটাশিয়াম। এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্যকর। যার ফলে হার্টের স্বাস্থ্য ভালো থাকে। গবেষণায় বলা হয়, প্রতিদিন দুটি কলা খেলে ৪০ শতাংশ হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। সেই সঙ্গে করনারি হার্ট ডিজিজও দূরে থাকতে বাধ্য হয়।

৯) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে:

কলায় প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি৬। এটি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যামিনো এ্যাসিড সৃষ্টি করে, রক্তে শর্করার পরিমাণ ঠিক রাখে এবং হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধি করে। বলা যায়, শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টির জন্য কলার দারুণ একটি খাদ্য উৎস। তাছাড়াও কলায় আছে ফ্যাটি এসিডের চেইন যা ত্বকের কোষের জন্য ভালো এবং শরীরকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।

এছাড়াও এই ফ্যাটি এসিড চেইন পুষ্টি গ্রহণ করতেও সাহায্য করে।

কলা স্বাদেও দারুণ সুস্বাদু; Image source: runner

১০) গর্ভাবস্থার সাহায্যে:

গর্ভাবস্থায় থাকাকালীন প্রতিদিন কলা খাওয়া প্রয়োজন। এতে প্রসব ভালোভাবে হয়। কলা রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়ায় যা গর্ভাবস্থায় সকালের ক্লান্তি ভাব দূর করে। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও কলা ভূমিকা রাখে। অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের জ্বর হলে ওষুধের বদলে খাওয়ানো হয় কলা। থাইল্যান্ডে গর্ভস্থ সন্তানের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে গর্ভবতী মায়েদের মধ্যে কলা খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।

মোদ্দাকথা, প্রতিদিন দুইটি কলা খাওয়ার সুফল অনেক। তাই আপনার খাবারের তালিকায় কলা রাখুন নিয়মিত।

Feature Image: live source