পরিচিতি

আমাদের সবার অতি পরিচিত একটি ফল খেজুর। তেমনি জনপ্রিয় ফলের মধ্যেও এটি অন্যতম।
খেজুরের ইংরেজি প্রতিশব্দ Date Palm। এটি এক ধরনের তালজাতীয় শাখাবিহীন বৃক্ষ। এর বৈজ্ঞানিক নাম ফিনিক্স ড্যাকটিলিফেরা (Phoenix dactylifera)। মাঝারি আকারের গাছ হিসেবে খেজুর গাছের উচ্চতা সাধারণত ১৫ মিটার থেকে ২৫ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।

এর পাতা লম্বা যা পাখির পালকের আকৃতিবিশিষ্ট। দৈর্ঘ্যে পাতাগুলো ৩ থেকে ৫ মিটার পর্যন্ত হয়। পাতায় দৃশ্যমান পত্রদণ্ড রয়েছে। এক বা একাধিক বৃক্ষ কাণ্ড রয়েছে যা একটিমাত্র শাখা থেকে আসে। খেজুরকে সাধারণত বলা হয় রাজকীয় ফল।

শুধু এর অতুলনীয় স্বাদ আর গন্ধের জন্য নয় বরং খেঁজুরের খ্যাতি রোগ নিরাময়ের জন্যও। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আলিয়ার (মদিনার গ্রাম) আজওয়া খেজুরে রোগ নিরাময়কারী এবং প্রাতঃকালীন প্রতিষেধক।’– সহিহ মুসলিম

মানব সভ্যতার ইতিহাসে সুমিষ্ট ফলহিসেবে এর গ্রহণযোগ্যতা অনেক বছর আগে থেকেই। তাই এর চাষাবাদও পুরনো সময় থেকেই। গাছটি প্রধানত ভালো জন্মে মরু এলাকায়।

খেজুর গাছ বেশি জন্মে মরুভূমিতে; Image source: joinourjourney

মূলত পবিত্র রমজান মাস বললেই খেজুরের চিত্র আমাদের চোখে ভেসে উঠে। রমজানে খেজুর দিয়ে ইফতার করা, মুমিন মুসলিমদের জন্য আল্লাহর বিশেষ একটা নিয়ামত। সারা দিনের ক্লান্তি দুর করতে একটি খেজুর আপনার জন্য যথেষ্ট।

শুধুমাত্র হাদিসে বর্ণিত তথ্যে খেজুরের গুরুত্বই নয় বর্তমান সময়ের বিভিন্ন বিজ্ঞানীরা খেজুর নিয়ে অনেক গবেষণায় খেজুরের বিভিন্ন গুণাগুণ সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। তাদের মতে পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ খেজুর অসাধারণ ঔষধিগুনে পরিপূর্ণ একটা ফল। তাই শুধু রমজানে নয়, সারা বছর খেজুর খেলে সুফলও পাবেন তেমন।

খেজুরের পুষ্টিগুণ

খেজুরের যেন পুষ্টিগুণের কোনো শেষ নেই!
পরিষ্কার ও তাজা খেজুরে আপনি পাবেন পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন-সি। প্রতি ১০০ খেজুরে পাবেন ২৩০ ক্যালরী শক্তি ৭৫ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ২.৫ গ্রাম প্রোটিন এবং ০.৪ গ্রাম ফ্যাট।

কাঁচা খেজুর; Image source: DatePalms

আয়রন থাকে ০.০৯ গ্রাম যা রক্ত তৈরির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতটুকু খেজুর শরীরের প্রতিদিনের আয়রনের চাহিদার ১১ ভাগ পূরণ করতে পারে। আয়রন রক্তস্বল্পতার সমস্যা কমাতে সাহায্য করে।
খেজুরে পাবেন গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, অত্যাবশ্যক ভিটামিন তো আছেই।

আছে পর্যাপ্ত পরিমাণে অ্যামাইনো অ্যাসিড। সাধারণত পাকা খেজুরে প্রায় ৮০ শতাংশ চিনিজাতীয় উপাদান রয়েছে। বাকী অংশে আছে সেলেনিয়াম ফ্লুরিন, ম্যাগনেসিয়াম, খনিজ সমৃদ্ধ বোরন, কোবাল্ট, ম্যাঙ্গানিজ, এবং জিঙ্কের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উপাদান।

সারা পৃথিবীতে খেজুর পাওয়া যায় প্রায় সাড়ে চারশ’ জাতেরও বেশি। মরুপ্রধাম অঞ্চল যেমন তুরস্ক, ইরাক এবং উত্তর আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চল মরক্কোয় খেজুরের উৎপত্তি প্রাচীনকাল থেকেই। এছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া, অ্যারিজোনা এবং দক্ষিণ ফ্লোরিডায় এখন খেজুরের চাষ করা হয়।

শুকনো খেজুর খেতে হবে পানিতে ভিজিয়ে; Image source: babycenter

সুস্বাস্থ্যের জন্য খেজুর

১) দীর্ঘমেয়াদি কাশি নিরাময়ে:
সাধারণত খুসখুসে কাশিকে আমরা উপেক্ষা করে যাই। তা অবশ্যই অনুচিত। এ থেকে বড় রোগ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কাশি নিরাময়ে খেজুর উপকারী। ২০-২৫ গ্রাম পিন্ড খেজুর, ২ কাপ গরম পানিতে সাড়া রাত ভিজিয়ে রাখুন।

সকালে ঘুম থেকে উঠে ওই খেজুর কচলে রসালো সরবতের মতো করে খেয়ে নিন। এই ভাবে আপনাকে প্রায় ১৫ দিন খেলে আপনার খুসখুসে কাশিতে সেরে আসবে।

২) ল্যাক্সাটিভ হিসেবে:
প্রাচীনকাল থেকেই কার্যকরী ল্যাক্সাটিভ হিসেবে খেজুর ব্যবহার করা হয়ে আসছে। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা ছাড়াও বদহজম, অ্যাসিডিটি এমন কী পাকস্থলীর আলসারেও ভীষণ উপকারী এই খেজুর। খেজুর শক্ত হলে তা ভিজিয়ে রেখে পরেরদিন সকালে খাবেন।

৩) হাড় গঠন ও শক্তি প্রদানে:
ক্যালসিয়াম হাড় গঠনে সহায়ক। খেজুরে প্রচুর পরিমানে ক্যালসিয়াম আছে যা হাড়কে মজবুত করে।
ক্যালসিয়ামের উপস্থিতি নানা প্রকার দাঁতের রোগে উপকার করে।

নানা প্রকারের খেজুর; Image source: tasteofhomes

৪) হৃদরোগ প্রতিরোধে:
রক্তে খারাপ কোলেস্টোরলের মাত্রা কমিয়ে খেজুর হৃদরোগের আশঙ্কা কমায়। খেজুরে সোডিয়ামের মাত্রা কম এবং পটাশিয়ামের মাত্রা বেশি থাকায় এটি হৃদযন্ত্রের পেশি সক্রিয়তা বাড়িয়ে দুর্বল হৃদপিণ্ডকে মজবুত করতে সক্ষম। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে খেজুর ব্লেন্ড করা জুস খেলে হার্টের সমস্যায় ভুক্তভোগী ব্যক্তি কিছু দিনের মধ্যে ভাল সমাধান পাবেন।

৫) দুর্বলতা কাটাতে:
খেজুরে পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালরি থাকে। ফলে যাদের স্বাস্থ্য দুর্বল, সামান্য পরিশ্রমে হাঁপিয়ে যান তাদের জন্য খেজুর নিয়মিত একটা খাবার হওয়া উচিত। নিয়মিত খেজুর খেলে শরীর ও মন দুটাই ভাল থাকে। বাড়ন্ত বাচ্চা, গর্ভবতী মহিলা, কিশোর-কিশোরীদের শক্তির যোগান ও দৈহিক বৃদ্ধিতে খেজুরের বিকল্প নেই।

৬) মস্তিষ্ককে সচল রাখতে:
খেজুরের অন্যতম গুণ এটি। খেজুর মস্তিষ্ককে প্রাণবন্ত রাখে। আমাদের ক্লান্ত শরীরে যথেষ্ট পরিমাণ শক্তির যোগান দিতে সক্ষম এই খেজুর।

৭) ডায়েট চার্টে:
যারা মুটিয়ে যাচ্ছেন দ্রুত কিন্তু না খেয়ে থাকতে পারেন না, সারাদিন শুধু খাই খাই মনে হয়ে তারা খেজুর খান। এক সঙ্গে বেশি খাওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমে যায় নিয়মিত খেজুর খেলে।

ডায়েট চার্টে খেজুর রাখুন; Image source: stylecraze

৮) ক্যানসার প্রতিরোধে:
নানান পুষ্টিগুণে খেজুর সমৃদ্ধ এবং প্রাকৃতিক আঁশে পূর্ণ। এক গবেষনায় দেখা গেছে খেজুর পেটের ক্যানসার প্রতিরোধ করে। ফলে যারা নিয়মিত খেজুর খান তাদের বেলায় ক্যানসারের ঝুঁকিটাও কমে যায় অনেকাংশেই।

৯) চোখের উপকারিতায়:
খেজুর দৃষ্টি শক্তি বাড়ায়। খেজুরের মধ্যে রয়েছে জিক্সাথিন ও লিউটেইন। এগুলো ম্যাকুলার ও রেটিনার স্বাস্থ্যকে ভালো রাখতে ভূমিকা রাখে।
আবার নাইট ব্লাইন্ডনেস বা রাত্রিকালীন অন্ধত্বের সমস্যা প্রতিরোধেও খেজুর পালন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

১০) মায়ের বুকের দুধে:
খেজুর বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের জন্য পুষ্টি সমৃদ্ধ একটি খাবার। এটি মায়ের দুধের পুষ্টিগুন আরো বাড়িয়ে দেয়। সাথে গড়ে তুলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা।

১১) শুক্রাণুর পরিমাণ বৃদ্ধিতে:
সাধারণত যাদের রৌদ্র সহ্য হয় কম এবং যৌনতায় দুর্বলতা আছে, সেই সাথে কোষ্ঠকাঠিন্যও আছে তারা নিয়মিত ১৫-২০ গ্রাম খেজুর আধা লিটার পানি এবং ১০০ মিলি লিটার দুধ মিশিয়ে এক সাথে ভাল করে সিদ্ধ করে এক কাপ রসালো পানি পান করলে উপকার পাবেন।

১২) রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে:
খেঁজুরের মধ্যে সোডিয়ামের পরিমাণ খুব কম। তাই এটি উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও উপকারী।

Feature Image: Medical news today