দশ বছর পর ‘বার্লিন পেশেন্ট’ নামে পরিচিত দ্বিতীয় একজন HIV থেকে কার্যকরভাবে মুক্তি পেলেন।দ্বিতীয়বারের জন্যও ডাক্তাররা প্রমাণ করতে সক্ষম হলেন যে, স্টেম কোষ স্থানান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এইচআইভি আক্রান্ত একজন রোগীকে খুব ভালোভাবে সুস্থ করে তোলা সম্ভব। ডাক্তাররা তাদের কাজ বিজ্ঞান জার্নাল ন্যাচারে প্রকাশ করেছিলেন এবং রেট্রোভাইরাসের উপর একটি বার্ষিক কনফারেন্সে উপস্থাপন করবেন এটি।

টিমোথি ব্রাউন, যিনি বার্লিন পেশেন্ট নামে পরিচিত, পৃথিবীর প্রথম এইচআইভি থেকে আরোগ্যলাভ করা মানুষ; Image Source: HIV Equal

তারা আশা করছেন সিয়াটল অন টুইসডে-তে অপরচুনেস্টিক ইনফেকশন নিয়ে উল্লেখিত তথ্যগুলো একই নিয়মের উপর ভিত্তি করে তৈরি নতুন জিন থেরাপি নিয়ে কাজ করতে বিজ্ঞানীদের উৎসাহী করে তুলবে এবং ইনফেকশন নিয়ে কাজ করতে আশাবাদী করবে।

টিমথি রে ব্রাউন প্রায় ১০ বছর পর ঘোষণা দেন যে তিনিও একজন বার্লিন পেশেন্ট যিনি সর্বপ্রথম কার্যকরভাবে এইচআইভি থেকে আরোগ্য লাভ করেন। চক্রাকার তীব্র একটি কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন এবং দুইটি বোন মেরো ট্রান্সপ্লান্টের পর তিনি এন্টায়ারেট্রোভাইরাল ঔষধগুলো খাওয়া বন্ধ করতে সমর্থ হোন।

রক্ত প্রবাহে HIV ভাইরাস; Image Source: The conversation

লন্ডনে যিনি সর্বশেষ ট্রান্সপ্লান্ট করিয়েছিলেন তিনি ২০১৭ এর সেপ্টেম্বর থেকে এন্টায়ারেট্রোভাইরাল ড্রাগ গ্রহণ করা বন্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু পত্রিকায় সে কথা প্রকাশিত হয়নি তখন। ফ্রেড হাচিনসন ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারের একজন লিডার ডা. কেইথ জেরোমি বলেছিলেন, ‘আমরা দ্বিতীয় একটি সাফল্য দেখার অপেক্ষায় আছি, এইচআইভি থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ খোঁজার চেষ্টায় আছি আমরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘টিমথি ব্রাউন কেবল একজন ছিলেন, এখন আশা করছি আরো কিছু আশ্চর্যের দেখা পাবো আমরা।’ জেরোমি ট্যুইসডে-তে প্রকাশিত রিসার্চের সাথে যুক্ত ছিলেন না। পেপারে উল্লেখিত রিসার্চাররা ছিলেন ব্রিটিশ, স্প্যানিশ, ডাচ এবং সিংগাপুরিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে।

রবীন্দ্র কে. গুপ্তা ছিলেন মূল উদ্ভাবক যিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যাম্ব্রিজ, ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন খবরটি যেন এভাবে ব্যাখা না করা হয় যে এইচআইভি আক্রান্ত সবাই ই এই প্রক্রিয়ায় সুস্থ হবে।

পোষক কোষে HIV-1 ভিরিয়ন এবং রিসিপ্টর; Image Source: Fred Hutchinson’s Jerome

ড. ব্রুস ওয়াকার যিনি HIV/AIDS এবং সংক্রামক ব্যাধির এমআইটি, হার্ভার্ডের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটালের সাথে সংযুক্ত র‍্যাগন ইন্সটিটিউটের ডিরেক্টর তিনি বলেছেন, ‘এইচআইভিতে আক্রান্ত সকলের পরিবর্তনে এই প্রক্রিয়া এখন আসতে পারবে না’ (ওয়াকার ন্যাচার রিসার্চের সাথেও যুক্ত আছেন)
তিনি আরও বলেন, ‘রিসার্চ এজেন্ডাতে এটি নতুন একটি পরিবর্তন নিয়ে এসেছে কারণ এটার মাধ্যমে সম্ভাব্য টেকসই একটি চিকিৎসা আমরা পেতে যাচ্ছি’

সম্ভাব্য টেকসই এই পথটি অর্জিত হয় CCR5 রিসিপ্টরের মাধ্যমে। CCR5 এমন একটি স্বল্পসংখ্যক রিসিপ্টর যেটিকে ব্যবহার করে HIV বিশেষ কোন কোষে প্রবেশ করতে পারে। একজন ব্যক্তির ইমিউন বা প্রতিরক্ষামূলক সিস্টেমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোষগুলো হচ্ছে CD4-positive T-cells।

ওয়াকার বলেন, ‘বলা যায় আপনি ভাবতে পারেন এই কোষগুলোই কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রধান হিসেবে সুষ্ঠুভাবে ভূমিকা রাখে। যদি এরা সঠিকভাবে সঠিক জায়গাটায় না থাকে তাহলে সেখানেই বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।’ কিছু মানুষের জিনে একটা বিশেষ মিউটেশন ক্ষমতা থাকে যেগুলো CCR5 রিসিপ্টরগুলোকে এনকোড করতে পারে আর সেজন্যেই এরা HIV কে T-cell এ প্রবেশ করতে বাধা দিতে পারে। তাই কোনো প্রবেশাধিকার নেই মানেই কোনো ইনফেকশনও নেই।

Keith Jeromy; Image Source: Seattle mate

ট্যুইসডে পেপারে যে ব্যক্তি নিয়ে বর্ণনা দেওয়া হয় তাতে বলা হয়েছিল তার বোন মেরোতে খুঁজে পাওয়া স্টেম সেলগুলো দাতার সেলের সাথে মিউটেশন ঘটানোর পাশাপাশি ট্রান্সপ্লান্টের মাধ্যমে রক্ত এবং ইমিউন সিস্টেম সেল উৎপাদন করা হয়। উত্তর ইউরোপিয়ান দেশগুলোর প্রায় ১০% মানুষই প্রাকৃতিকভাবে এই মিউটেশন বহন করে চলছে।

টিমথি ব্রাউনের ট্রান্সপ্লান্ট ঘটানো হয়েছিল তার ক্যান্সারের চিকিৎসা হিসেবে। ডাক্তার তার লক্ষণ দেখে নির্ণয় করলেন যে তিনি Hodgkin’s lymphoma এর এডভান্সড কেসে আছেন তাই তাকে কেমোথেরাপির মধ্যে নেওয়া হয় এবং একজন ডোনোরের কাছ থেকে অংশ সংগ্রহ করে ট্রান্সপ্লান্টের মাধ্যমে CCR5 এর মিউটেশন ঘটানো হয়।

ব্রাউনের ক্যান্সার ট্রিটমেন্ট তুলনামূলক সহজ ছিল কারণ তার পুরো দেহ রেডিয়েশনের সাথে জড়িত ছিল না এবং তার কেমোথেরাপি প্রক্রিয়া ছিল সহজ।
এই বিষয়টিই উৎসাহমূলক ছিল কিন্তু র‍্যাগন রিসার্চার ওয়াকার জানালেন ক্যান্সার ট্রিটমেন্টের বাইরে গিয়ে এই ধরণের স্টেম সেলের ট্রান্সপ্লান্টে ঝুঁকি কিছুটা থেকেই যায়।

কিন্তু এটা সত্য যে এন্টায়ারেট্রোভাইরাল মেডিকেশনের মাধ্যমে HIV আক্রান্ত মানুষের জীবনের প্রত্যাশা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এবং গবেষণায় দেখা যায় এটা প্রায় স্বাভাবিক হয়ে আসছে যে ‘মানুষজনকে ইদানীং যেকোনো অতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণ করতেও বশে আনা যাচ্ছে’ তিনি আরও বলেন, এটা এমন নয় যে GlaxoSmithKline প্রক্রিয়াটিতে কোনো ঝুঁকি নেই কিন্তু থাকলেও খুব কম।

কৃত্তিমভাবে একটি ড্রাগের মাধ্যমে CCR5 মিউটেশনের ভাইরাস-ব্লকিং পাওয়ার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ২০০৭ সাল থেকে Viiv হেলথকেয়ার Pfizer এবং GlaxoSmithKline এর মাধ্যমে একটি ড্রাগ তৈরির মিশ্র উদ্যোগ নেয় যেটি ইউনাইটেড স্ট্যাটে Selzentry নামে পরিচিত। এটি নিজের রিসিপ্টরের সাথে CCR5 রিসিপ্টর বাইন্ড করে HIV প্রতিরোধ করে।

সেলজেন্ট্রি ড্রাগ ; Image Source: RxList

তবে অন্যান্য ঔষধের মত এটিরও একই সমস্যা আছে। প্রতিদিন খেতে হবে এটি। ফ্রেড হাচিনসন জেরোমি বলেন, ‘HIV এর অন্যসব দমনকারী থেরাপির মত এটিও একই, একজন ব্যক্তি যখনই ঔষধটি সেবন বন্ধ করে দিবে, ভাইরাস পুনরায় গর্জন করে ফিরে আসবে।’

জেরোমি আরও বলেন, ‘CCR5 কে টার্গেট করে ট্রান্সপ্লান্টেশন বা জিন থেরাপির সৌন্দর্যটি এরকম যে এটি আপনি একবারই করবেন এবং রোগী সুস্থ হয়ে যাবে। এরপরে ভাইরাসগুলো নিয়ে আর চিন্তার কিছু নেই এবং প্রতিদিন ঔষধ খাওয়ার মত বিড়ম্বনারও দরকার হবে না’

জেরোমির পাশাপাশি ফ্রেড হাচিনসন ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারের আরেকজন রিসার্চার বলেন নতুন এই রিপোর্টটি আমাদের কাছে এখন অনেক অর্থবহ। এটা মনে রাখতে হবে কতটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজটি আমাদেরকে সম্পন্ন করতে হচ্ছে, ভাইরাসের সাথে যুদ্ধ কতটা সাহসিকতার পরিচয় দিচ্ছে। কিন্তু সাথে সাথে আমার আশার আলো দেখতে পাচ্ছি এটাই হচ্ছে সার্থকতা।

তিনি আরো বলেন, এখন শুধু এখানে HIV আক্রান্ত থেকে সুস্থ হওয়া একজন নয় দুইজন মানুষ বেঁচে আছে আর তারাই তো আমাদের সাহস, উৎসাহ।

Featured Image : Vox