একজন নিরামিষভোজী সাধারণতই নানারকমভাবে উপকৃত হয়ে থাকেন। ওজন কমানো তো আছেই, বিভিন্ন ক্রোনিক ডিজিস অর্থাৎ দীর্ঘস্থায়ী রোগবালাই থেকেও রেহাই পান তিনি। সুষম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যই মূলত একজন নিরামিষাশীর প্রধান লক্ষ্য তবে প্রায়শই তা নিয়ন্ত্রণ করে চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

তাই সে একটি পরিকল্পনার মধ্যে দিয়ে যায়, যার ফলে পুষ্টিসংক্রান্ত অভাব এবং স্বাস্থ্যহানি থেকে রক্ষা পান।
এই আর্টিকেলে একজন নিরামিষাশীর তেমন পরিকল্পনা নিয়েই কথা বলবো আমরা। দেখাবো যে নমুনা চার্ট দিয়ে তিনি শুরু করেন।

নিরামিষাশী খাদ্যসংযম কাকে বলে?

নিরামিষাশী খাদ্যসংযম হচ্ছে একটি খাদ্যতালিকার পরিকল্পনা যেখানে সব ধরণের প্রাণীজ পণ্য যেমন মাংস, মাছ, ডিম, দুগ্ধজাত পণ্য এবং মধু বাদ রাখতে হয়। মানুষ সাধারণত ভেগানিজম বা নিরামিষভোজনের সিদ্ধান্ত নেয় নানা কারণে। কেউ নৈতিক সতর্কতা থেকে কেউবা ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের জন্য।

নিরামিষাশীর কেনাকাটার লিস্ট

একজন সুস্থ নিরামিষাশীর উচিত গোটা শস্য, আমিষ, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ফলমূল এবং শাকসবজি খাওয়া।
বাদাম, বীজ, শীম, সয়া সস এবং পুষ্টিকর ইস্ট খাওয়া যা তাকে সারাদিনের আমিষের যোগান দিবে।
আবার এভোকেডো তেল, নারিকেল তেল এবং জলপাই তেলও পুষ্টিকর যা থেকে নিরামিষাশী তার স্বাস্থ্যেকর চর্বির যোগান দিতে পারেন।

এখানে তেমন একটি নমুনা দেওয়া হলো যা দিয়ে একজন ব্যক্তি নিরামিষাশী হিসেবে শুরু করবেন :

তাজা দ্রব্য

শাক-সবজি : শতমূলী, ক্যাপসিকাম, ব্রুকলি, বাঁধাকপি, গাজর, ফুলকপি, রসুন, পাতা কপি, পেঁয়াজ, আলু, পালংশাক, টমেটো, ধুন্দুল ইত্যাদি

ফলমূল: আপেল, কলা, কালো জাম, আঙ্গুর, জাম্বুরা, লেবু, কমলা, পিচফল, নাশপাতি, ডালিম, স্ট্রবেরি, লাইম ইত্যাদি।

ফ্রুট সালাদ; Image source: plated.com

বরফজাত দ্রব্য

শাকসবজি : ব্রুকলি, অঙ্কুরিত বীজ, বাটারনাট স্কোয়াশ, গাজর, ফুলকপি, শস্য, সবুজ শীম, ডাল বা মটর দানা, শাকসবজির মিশ্রণ ইত্যাদি।

ফলমূল : ব্লু বেরি, চেরি, ব্ল্যাক বেরি, আম, আনারস, রাস্পবেরি, স্ট্রবেরি ইত্যাদি।

শস্যজাতীয়

বার্লি, লাল চাল, চালের গুড়া, ওটস।
আর আছে রুটি এবং পাস্তা।

আমিষের উৎস সমূহ

বাদাম: কাজুবাদাম, ব্রাজিল নাট, হিজলি বাদাম, হ্যাজেল নাট, চিনাবাদাম, পিক্যান, পেস্তা বাদাম, আখরোট।

বীজ: অতসীর বীজ, ভাং বীজ, কুমড়ার বীজ, তিলের বীজ, সূর্যমূখীর বীজ ইত্যাদি।

শিম জাতীয়: কালো শিম, ছোলা, কিডনী বিন, ডাল, ন্যাভি বিন, পিন্টু বিন ইত্যাদি।

কিডনী বিন; Image source: mydadri

স্ন্যাক ফুডস: শুকনো ফল, ফলের ছোলা বা আচার, নাট বাটার, হুম্মুস, পিঠা, চিপ্স, ভুট্টার খই, সেদ্ধ ছোলা, কোঁকড়ানো সাগর শৈবাল ইত্যাদি।

মিষ্টি: নারকেলের মিষ্টি, খেঁজুর, ম্যাপল সিরাপ, ঝোলা গুড় ইত্যাদি।

মশলা এবং আচার: গোলমরিচ, মরিচের গুড়া, দারুচিনি, হলুদের গুড়া, রসুন, আদা, লংকা গুড়া ইত্যাদি।

খাদ্য পরিকল্পনার নমুনা

এখানে এক সপ্তাহের একটি খাদ্য পরিকল্পনা দেওয়া হলো যেখানে কিছু পুষ্টিকর খাদ্যেরও উল্লেখ আছে ফলে একজন নিরামিষাশী তা উপভোগ করতে পারবেন।

সোমবার

নাস্তা: মাশরুমের সাথে অল্প মাংস, এভোকেডো এবং নেতানো এরোগোলা (এক ধরনের শাক)।
দুপুরে: শস্যসমৃদ্ধ পাস্তা, মসুরের ডাল, মিটবল এবং একটু সালাদ।
রাতে: ফুলকপি এবং ছোলা বুট।
স্ন্যাক্স : পপকর্ন, ক্যাল চিপ্স এবং সবজির মিশ্রণ।

এরোগোলা; Image source: Harrisfarm

মঙ্গলবার

নাস্তা: জামের সাথে কোকোনাট ইয়োগার্ট, আখরোট এবং শিয়া বীজ।
দুপুরে: লাল বাঁধাকপি, ব্রাসেল স্প্রাউট এবং কাউসকাউস।
রাতে: মাশরুম, রসুন দিয়ে ডালের ডেলা, ফুলকপি এবং ইতালিয়ান সবুজ শিম।

বুধবার

সকাল: মিষ্টি আলুর টোস্ট, পিনাট বাটার এবং কলা।
দুপুরে: সালাদ, এভোকেডো, টমেটো, পেঁয়াজ, শিম।
রাতে: সুইস চার্ডের সাথে ওট, মাশরুম এবং বাটার নাট।

বৃহস্পতিবার

নাস্তা: ব্রুকলি, টমেটো, শাক এবং টফু।

দুপুরে: ছোলা বুট, লাল চালের সাথে শাক তরকারি।
রাতে: শসা, জলপাই, গোলমরিচ সূর্যে শুকানো টমেটো, পাতাকপি এবং পার্সলে শাক দিয়ে সালাদ।

স্বাস্থ্য উপকারী টফু; Image source: Healthline

শুক্রবার

নাস্তা: মিষ্টি কুমড়ার বীজ, দারুচিনি এবং আপেলের স্লাইসের সাথে রাতে ভিজিয়ে রাখা ওটস, এবং নাট বাটার।
দুপুরে: সেদ্ধ ব্রুকলির সাথে কালো শিমের সবজি বার্গার এবং মিষ্টি আলুর ওয়েজেস।
রাতে: চিজের সাথে পুষ্টিকর ইস্ট এবং কলার্ড গ্রিন।

শনিবার

নাস্তা: টেম্পেহর সাথে স্কিলেট, ব্রুকলি, কেল, টমেটো।
দুপুরে: আদা-রসুনের টফু, ভেজিটেবল এবং কুইনোয়া।
রাতে: ছোলা বুটের সাথে শিম , টমেটো, কর্ন, মরিচ এবং পেঁয়াজের সালাদ।

তান্দুরি টেম্পেহ; Image source : ascention kitchen

রবিবার

নাস্তা: দানাদার টোস্ট, এভোকেডো এবং প্রোটিন শেকের সাথে ইস্ট।
দুপুরে: লেন্টিল চিলির সাথে গ্রিল্ড এসপারাগাস, সেদ্ধ আলু।
রাতে: লাল চালের সাথে সবজি, পেঁয়াজ, টমেটো, মরিচ।

সাথে প্রতিদিন স্ন্যাক হিসেবে রাখতে পারেন – হিমায়িত আঙুর, কুমড়ার সেদ্ধ বীজ, শাকের সাথে আলমন্ড বাটার ইত্যাদি।

সতর্কতা সমূহ

যদিও নিরামিষ ভোজন স্বাস্থ্যকর এবং পুষ্টিকর তবুও নিরামিষাশী যদি সঠিকভাবে পরিকল্পনা না করেন তাহলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। তাই সেক্ষেত্রে যেসব সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত তা হলো –

পুষ্টির অভাব

ভেগান ডায়েটে পুষ্টির অভাব দেখা দিতে পারে।
যেহেতু মাছ, মাংস, পোল্ট্রির মতো উন্নত কিছু আমিষ এই খাদ্যতালিকায় থাকে না। এগুলোতে আরো আছে আয়রন, জিংক, ভিটামিন বি১৩, ফসফরাস এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডের মতো পুষ্টি যেগুলোর অভাব উদ্ভিজ্জ খাদ্য দিয়ে পোষানো কঠিন।

প্রাণীজ পণ্য যেমন ডিম এবং দুধে আছে উচ্চতর প্রোটিন এবং মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট যেমন ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, আয়োডিন, ম্যাগনেসিয়াম ইত্যাদি। তাই দৈনন্দিনের খাবার থেকে এগুলো সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া মানে হচ্ছে অপুষ্টিহীনতার ঝুঁকি তৈরি করা। তৈরি হতে পারে এনিমিয়া, দুর্বল হাড় এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় অক্ষমতা।

তাই সচেতন থেকে আপনাকে খেতে হবে বৈচিত্রময় খাবার যেমন উদ্ভিজ্জ দুধ, খাদ্যশস্য, পুষ্টিকর ইস্ট, ইত্যাদি যেগুলো প্রাণীজের অভাব অনেকটাই কমিয়ে আনবে। আরো খেতে হবে কলাই, সয়া সস, বাদাম এবং বীজ।

শেষকথা

একজন ভেগান স্বাস্থ্যকর এবং পুষ্টিকর খাবার খেয়ে থাকেন বলে নানারকম ভোগান্তি যেমন হৃদরোগ, ব্লাড স্যুগার, অতিরিক্ত ওজন ইত্যাদি থেকে রক্ষা পান।
তবে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে যেহেতু প্রাণীজ কোনো খাবার খাওয়া হচ্ছে না তাই খাদ্যতালিকায় যেন এমন খাবারগুলো থাকে যা আপনার পুষ্টির অভাব পূরণ করতে সক্ষম হবে।

যদি আপনি ভেগানিজমে আগ্রহী হয়ে উঠেন তাহলে এই তালিকাটি মেনে চলার মাধ্যমেও পথ চলা শুরু করতে পারেন।

Feature Image: The Swag