এমনিতেই বাদাম জনপ্রিয় খাবারের মধ্যে একটি।
খেতে সুস্বাদু, সহজলভ্য তাই কিটো বা ভেগান যেকোনো ডায়েটেই এটি উপযোগী। খারাপ চর্বির পরিবর্তে বাদামে থাকে দারুণ গুণাগুণ সম্পন্ন কিছু উপাদান যা ওজন কমাতেও সহায়তা করে।

এখানে বাদামের তেমনই ৬ টি উপকারী দিক তুলে ধরা হলো:

বাদাম কী?

বাদাম হচ্ছে বীজ শস্য যেগুলো রান্না বা স্ন্যাকেও প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। ফ্যাট এবং ক্যালরির দারুণ একটি উৎস এটি। খাওয়ার অনুপযুক্ত শক্ত একটি আবরণে বীজ আবৃত থাকে এবং আবরণ ভেঙ্গে তাদেরকে উন্মুক্ত করতে হয়।

তবে স্টোর থেকে ক্রয়কৃত এমন অনেক বাদাম আপনি পাবেন যেগুলো খাওয়ার জন্য ইতোমধ্যে খোলস অনাবৃত থাকে।

হ্যাজেল নাট; Image source: Phys.org

সচরাচর পাওয়া যায় এমন কয়েকটি বাদাম হলো:

  • এলমন্ড বা কাজুবাদাম
  • ব্রাজিল নাট
  • হিজলি বাদাম বা ক্যাশিউ
  • হ্যাজেল নাট
  • ম্যাকাডেমিয়া নাট
  • পিক্যান
  • পাইন নাট
  • পেস্তা বাদাম
  • আখরোট

১) নানান পুষ্টির দারুণ উৎস

বাদাম খুবই পুষ্টিকর খাদ্য। এক আউন্স (২৮ গ্রাম) বাদামে থাকে:

ক্যালোরি: ১৭৩, প্রোটিন: ৫ গ্রাম, ফ্যাট: ৯ গ্রাম মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাটসহ মোট ১৬ গ্রাম, কার্বোহাইড্রেট: ৬ গ্রাম, ফাইবার: ৩ গ্রাম, ভিটামিন ই: RDI এর ১২%, ম্যাগনেসিয়াম: ১৬%, ফসফরাস: ১৩%, কপার: ২৩%, ম্যাঙ্গানিজ: ২৬%, সেলেনিয়াম: ৫৬%

বিশেষ কিছু বাদামে অন্যান্য বাদামের চেয়ে বেশি পুষ্টিগুণ থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রাজিল নাটে সেলেনিয়ামের পরিণাম ১০০% (RDI) এরও বেশি থাকতে পারে। শর্করার পরিমাণও বাদাম বিশেষে নানারকম হয়। বলা হয়ে থাকে, লো-কার্ব ডায়েটের জন্য বাদাম একটি চমৎকার খাদ্য উপাদান।

২) এন্টি-অক্সিডেন্টে ভরপুর

কাজু বাদাম স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ উপকারী; Image source: Her jindegi

বাদামকে বলা যায় এন্টি-অক্সিডেন্টের শক্তিঘর। যে সমস্ত ফ্রি রেডিকেল শরীরের জন্য ক্ষতিকর, কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং রোগবালাইকে উসকে দেয়, বাদামের এন্টিঅক্সিডেন্ট সেগুলোর অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের সাথে যুদ্ধ করে তাদের তৎপরতা নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে ফ্রি রেডিকেলের সাথে মাছের চাইতেও আখরোট বেশি যুদ্ধ করতে পারে।
আখরোট এবং কাজুবাদামের এন্টি অক্সিডেন্ট কোষের উপাদেয় ফ্যাটকে অক্সিডেশনের হাত থেকে রক্ষা করে।

১৩ জন ব্যক্তির উপর সমীক্ষা করে দেখা গেছে যে ওয়ালনাট বা আলমন্ড খেলে পলিফেনল লেভেল বৃদ্ধি পায় এবং অক্সিডেটিভ ড্যামেজ কমে যায় চোখে পড়ার মতো। অন্য একটি গবেষণায় পাওয়া গেছে পিক্যান খাওয়ার ২-৮ ঘন্টা পর ব্যক্তির হৃদরোগের ঝুঁকি কমে আসে খারাপ LDL ২৬-৩৩% কমে যাওয়ার মাধ্যমে।

৩) ওজন কমাতে বাদাম কার্যকরী

যদিও বাদাম উচ্চ ক্যালরির খাবার তবুও গবেষণা বলে যে এটি শরীরের ওজন কমাতে কার্যকরী।
একটি পরীক্ষার মাধ্যমে ওজন কমাতে বাদামের কার্যকারিতা নির্ণয়ের সময় দেখা গেছে যে বাদাম খেয়ে মানুষ তার কোমরের প্রায় ২ ইঞ্চি (৫ সেমি) মেদ কমাতে সক্ষম! যা কিনা অলিভ অয়েলের চেয়েও বেশি কার্যকরী।

আরো দেখা গেছে যে অতিরিক্ত ওজনের নারীরা নিয়মিত আখরোট খেয়ে অতিরিক্ত ওজনের এক তৃতীয়াংশ কমাতে সক্ষম হন। বিশেষ করে কোমরের ওজন কমাতেই এটি বেশি কার্যকরী।

গবেষণা মতে, বাদাম উচ্চ পরিমাণে ক্যালরি ধারণ করলেও তার পুরো অংশ শরীরের শোষিত হয় না বরং পরিপাকের সময় বাদামের আঁশে তা ফ্যাটের টুকরা হিসেবে আঁটকে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এক আউন্স বাদামে ক্যালরির পরিমাণ ১৬০-১৭০ যেখানে আমাদের শরীর তার ১২৯ ক্যালরি শোষণ করতে পারে।

৪) টাইপ ২ ডায়বেটিস এবং মেটাবলিক সিনড্রোমের জন্য উপকারী

উদ্বেগ কমাতেও সাহায্য করে আখরোট; Image source: The economic times

পৃথিবীর প্রায় কয়েকশো মিলিয়ন মানুষ সাধারণ একটি রোগ টাইপ ২ ডায়বেটিসে ভুগছে। আর মেটাবলিক সিন্ড্রোম হচ্ছে কতগুলো একটি গ্রুপের সমন্বয় যা হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং টাইপ ২ ডায়বেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। তাই বলা যায় টাইপ ২ ডায়বেটিস এবং মেটাবলিক সিনড্রোম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

মজার ব্যাপার হচ্ছে যারা এই সমস্যা দুটোয় ভুগছেন তাদের জন্য বাদাম হচ্ছে অন্যতম উপাদেয় একটি খাদ্য। কারণ হিসেবে বলা যায় তাদের স্বল্প পরিমাণের কার্বোহাইড্রেট এবং ব্লাড সুগার লেভেলকে দমিয়ে রাখার ক্ষমতা। বাদাম খেলে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, ব্লাড প্রেসারের পাশাপাশি ডায়বেটিসের ঝুঁকিও কম থাকে।

প্রায় ১২ সপ্তাহের নিয়ন্ত্রিত একটি গবেষণা মতে, যে ব্যক্তিদের মেটাবলিক সিন্ড্রোম আছে তারা যদি দিনে মাত্র দুইবার ১ আউন্সেরও (২৫ গ্রাম) কম পরিমাণ পেস্তা বাদাম খান তাহলে ব্লাড সুগারের পরিমাণ প্রায় ৯% কমে যায়।

৫) প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে

বাদামের আছে শক্তিশালী এন্টি-ইনফ্ল্যামাটরি বৈশিষ্ট্য।

সাধারণত জ্বালাপোড়া বা ইনফ্ল্যামেশন হয় যখন আমাদের শরীর আঘাত, ব্যাকটেরিয়া বা অন্যকোনো শক্তিশালী ক্ষতিকর জীবাণুর সাথে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তবে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ আমাদের অঙ্গের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে এবং রোগ সৃষ্টির ঝুঁকিও বাড়ায়।

বিভিন্ন প্রকারের বাদাম; Image source: food.ndtv

গবেষণা বলে যে, বাদাম খেলে শরীরের প্রদাহ কমাতে এটি ভূমিকা রাখে এবং সুস্বাস্থ্য বহন করে।
বাদাম খাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা গিয়েছে ইনফ্ল্যামেটরি মার্কার সি-রিয়েক্টিভ প্রোটিন (CRP) এবং ইন্টারলিউকিন ৬ এর পরিমাণ কমে যায় প্রায় ৩৫% এবং ৯০% পর্যন্ত!

৬) বাদাম উপকারী আঁশ সমৃদ্ধ

আঁশ বা ফাইবারের স্বাস্থ্য উপকারী অনেক দিক আছে। আমাদের শরীর আঁশ হজম করতে পারে না তখন কোলনে বসবাসকৃত ব্যাকটেরিয়া তা করে। বিভিন্ন প্রকার আঁশ পরিপাকতন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াদেরকে সুস্থ রাখতে খাদ্য হিসেবে কাজ করে।

গাট ব্যাকটেরিয়া তখন আঁশের গাঁজন ঘটায় এবং এটিকে উপকারী শর্ট চেইন ফ্যাটি এসিডে (SCFAs) রূপান্তর করে। এই SCFAs এর শক্তিশালী কিছু উপকার রয়েছে যেমন এটি গাট বা পরিপাকনালীর সুস্বাস্থ্য রক্ষা করে, ডায়বেটিস কিংবা স্থুলতার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

পাশাপাশি আঁশ আমাদের পেট ভরা রেখে কম খাদ্য গ্রহণ করতে সহায়তা করে। ১ আউন্স বাদাম যে পরিমাণে আঁশ ধারণ করে:

আখরোট: ৩.৫ গ্রাম, পেস্তা: ২.৯ গ্রাম, হাজেলনাটস: ২.৯ গ্রাম, পিক্যান: ২.৯ গ্রাম, চিনাবাদাম: ২.৬ গ্রাম ম্যাকাডামিয়াস: ২.৪ গ্রাম, ব্রাজিল বাদাম: ২.১ গ্রাম।

মোদ্দাকথা, সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে নানান পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ বাদামের জুড়ি নেই।

Feature Image: The Independent