বর্তমান কালে সূর্য, ত্বকের উপর এটির প্রভাব এবং কিভাবে ত্বক সূর্য থেকে আমাদের রক্ষা করে তা নিয়ে কথা হচ্ছে অনেক রকমেরই। ত্বক হচ্ছে আমাদের দেহের সবচেয়ে বড় তন্ত্র। এটাও বলা হয়ে থাকে যে ত্বক হচ্ছে আমাদের স্বাস্থ্যের জানালা।

তো স্বাস্থ্যের জানালা বলতে কি বুঝায় আসলে?
এটা বুঝায় যে আপনার পুরো শরীরটা যে আকারে দেখা যাচ্ছে দৃশ্যমান সে পুরোটা অংশই আপনার ত্বক।
ত্বক দেখতে কেমন? শুষ্ক নাকি আর্দ্র? কী করে এটি আমাদের? এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমাদের কী করণীয়?

ত্বকের উদ্দেশ্য

ত্বকের অনেক ধরণের উদ্দেশ্যের মধ্যে একটি হচ্ছে বাইরের পরিবেশ থেকে আমাদের শরীরকে রক্ষা করা। সানবার্ন, তামাটে রঙ, ছুলি (কখনো কখনো) এবং বয়স্ক দাগ ইত্যাদি মূলত হয়ে থাকে অতিরিক্ত আল্ট্রাভায়োলেটের সংস্পর্শে থাকলে।

ত্বকে ফোস্কা বা ব্লিস্টার; Image source: Wikipedia

যখন ইউভি রশ্মির উপস্থিতি থাকে, এমনকি শীতকাল বা মেঘলা দিনগুলোতেও এটি তখন গরমের সময়গুলোর চেয়েও ত্বকের জন্য আরো বেশি ক্ষতিকর হয়ে উঠে। কারণ মানুষ এই সময়টা বাইরে থাকে বেশি তাই এক্সপোজারের (UV রশ্মির) সময়টাও দীর্ঘ হয়।

গ্রীষ্মকালেও আমরা বের হই নানা কারণে। কর্মক্ষেত্রে যাওয়া ছাড়াও হাঁটতে বের হই, বাগানে কাজ করি, বাচ্চাদের সাথে খেলি। তাই আমাদের জানাও উচিত আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য সূর্য কতটা জরুরি এবং কতটুকু বেশি হয়ে গেলে তা হয়ে উঠে ক্ষতিকর।

এই আর্টিকেলে এমন চারটি উদ্ভিদ নিয়েই কথা বলতে যাচ্ছি যেগুলো আপনার ক্ষতিগ্রস্ত ত্বককে সারিয়ে তুলার পাশাপাশি ক্ষতিকর আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি থেকে রাখবে সুরক্ষিত।

১) এলো

নানান চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় এলোভেরা; Image source: Planet organate

ত্বককে শীতল করার ক্ষমতা আছে এলোর এবং ত্বকের যত্নে এটি অন্যতম সেরা ঔষধি গাছ। কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ? যখন আপনি দীর্ঘক্ষণ সূর্যের আলোতে থাকেন তখন ত্বক কিছুটা পুড়ে যায়। আবার এটাও জানি যে ৯০% এর মতো কোলাজেন উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে সেই ত্বক আবার পুনর্জন্ম লাভ করে। ত্বকের অন্যতম প্রধান গাঠনিক উপাদান হিসেবে কোলাজেন খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এটিতে।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে কোলাজেন ধীরে ধীরে অদৃশ্য হতে থাকে। গ্রীষ্মকালে ক্ষতিগ্রস্ত ত্বক রক্ষার্থে এলো ব্যবহৃত হয়। সতেজ এলো গাছ থেকে প্রথমে এলোর একটি টুকরা কেটে নিন, ফালি করে কাটুন এটি। পরে ঘষে ঘষে এলোর ভেতরের জেল বের করে ফেলুন। চামচের সাহায্য নিয়ে বা ব্লেন্ডার করে তরলে পরিণত করুন এটি। দিনে কয়েকবার তা ত্বকের মধ্যে ঘষে লাগান।

আপনি বিভিন্ন গ্রোসারি স্টোর, ডিসপেনসারি বা বাজার থেকেও অর্গানিক এলো জেল বা জুস কিনে আনতে পারেন এবং ব্যবহার করতেন পারেন একই উপায়ে।

২) কমফ্রে

কমফ্রে গাছ; Image source: Educalingo.com

কমফ্রে হচ্ছে কানেক্টিভ টিস্যু হার্ব যেটি আপনার ক্ষতিগ্রস্থ ত্বক বা চামড়াকে আগের অবস্থায় ফিরে আসতে সাহায্য করবে। এটি ‘সেল প্রলিফেরেট’ নামেও পরিচিত যার মানে হচ্ছে কোষের পুনর্জন্মকে (নতুন কোষের বৃদ্ধি) এটি উদ্দীপিত করে।

সূর্যের আলোর সংস্পর্শে থেকে ত্বক বেশি পুড়ে গেলে (সানবার্ন) বা ফোস্কা পড়লে, তার চিকিৎসার জন্য কমফ্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা দেয়। সানবার্ন বলতে বুঝায় যখন আপনি অনেক বেশি পরিমানের UV (আল্ট্রা ভায়োলেট) রশ্মির সামনে থাকেন তখন আপনার চামড়ার উপরিভাগ পুড়ে যায় বা উপরিভাগের ত্বকীয় কোষগুলো মরে যায়। মাঝেমধ্যে দ্বিতীয় স্তরও ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফলে ফোস্কা পড়ে।

ক্ষতিগ্রস্ত ত্বকে কমফ্রে ব্যবহার করতে প্রথমে এটির গলিত রুপ অর্থাৎ ইনফিউশন তৈরি করুন এবং একটি কটন বলের সাহায্যে আপনার সানবার্নে ধীরে ধীরে বুলান। দিনে কয়েকবার দিন। আপনি চাইলে স্প্রে বোতলেও এটি সংরক্ষণ করতে পারেন এবং চামড়াতে ছড়িয়ে দিতে পারেন।

৩) হর্সটেইল

উপকারী উদ্ভিদ হর্সটেইল; Image source: carpco.co.uk

হর্সটেইল এমন একটি উদ্ভিদ যেটি উচ্চমানের পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ যা দেহের পুষ্টি যোগাতে এবং দেহকোষ তৈরিতে সহায়তা করে। ক্ষত বা আঘাত সারাতেও এর জুড়ি নেই। হর্সটেইলে পর্যাপ্ত পরিমাণে সিলিকা রয়েছে। সিলিকা একটি খনিজ যা আমাদের দেহের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান কোলাজেন তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

সংক্ষিপ্তভাবে বলতে গেলে কোলাজেন আমাদের সমগ্র শরীরকে একত্র করে রাখে। এটি ত্বকে স্থিতিস্থাপকতা এবং নমনীয়তা প্রদান করে। পাশাপাশি হাড়, চুল এবং নখেও প্রদান করে শক্তি এবং নমনীয়তা। গরমে ত্বকে ব্যবহারের জন্য আপনি হর্সটেইল পাউডারের তৈরি ক্যাপসুল খেতে পারেন অথবা খাবার বা স্মুথিতেও এটির পাউডার মিশিয়ে খেতে পারেন আপনি।

তাছাড়াও এটি দিয়ে বানাতে পারেন চা এবং অল্প এলকোহলযুক্ত টিংচারের (২৫% এলকোহল) সাথেও খেতে পারেন। কিভাবে খাচ্ছেন এটা কোনো ব্যাপার নয়, শুধু মনে রাখবেন এটি আপনার শরীরে প্রবেশ করে আপনার ত্বককে শক্তিশালী এবং সুন্দর থাকতে সাহায্য করবে!

নোট: হর্সটেইল দীর্ঘদিনের জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। তাতে কিডনিতে প্রদাহ সৃষ্টি হওয়ার আশংকা থেকে যায়।

৪) ক্যালেন্ডুলা

মনোরম ক্যালেন্ডুলা; Image source: turtle tree seed

গ্রীষ্মকালীন দারুণ একটি ফুল এই ক্যালেন্ডুলা। এটির যে শুধুমাত্র এন্টি-ইনফ্ল্যামেটরি এবং এন্টি-ব্যাকটেরিলা গুণাবলীই আছে তা নয়, কোলাজেন উৎপন্নের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত চামড়াকে পৃষ্ঠপোষকতা করা এবং দেহের আঘাত সারিয়ে তুলতেও এর জুড়ি নেই। যদি আপনার কুৎসিত সানবার্ন হয়ে থাকে যার কারণে ত্বকে ফোস্কা পড়ে যায় তবে জেনে রাখুন আপনার ত্বকের উপরিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সেই সময়ে শুধু যে বার্ন থেকে আপনার ত্বককে রক্ষা করতে হবে তাই নয়, যেন কোনো প্রকার সংক্রমণ থেকে আপনার ত্বক প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে পারে সেদিকেও মনোযোগী হতে হবে। ক্যালেন্ডুলা আপনার এই দুটি কাজেই একসাথে সহায়তা করবে।

গ্রীষ্মে ক্ষতিগ্রস্ত ত্বকে ক্যালেন্ডুলা ব্যবহার করতে চাইলে প্রথমে এটির গলিত তেল তৈরি করুন যেখানে সুইট আলমন্ড বা গ্রেপসিড অয়েলও মিশ্রিত থাকবে। আপনার পুড়ে যাওয়া ত্বকে দিনে কয়েকবার তা ব্যবহার করুন। আপনি চাইলে ক্যালেন্ডুলার তেলকে মলম হিসেবেও প্রস্তুত করতে পারেন।

তার জন্য এটির সাথে এলোর সামান্য জুস ব্লেন্ড করতে হবে। ফলে একটি ক্রিম তৈরি হবে যেটি আপনার ফোস্কা পড়া এবং পুড়ে যাওয়া অংশে ব্যবহার করবেন।

Feature Image: Nyka