দুশ্চিন্তা আপনার মানসিকতাকে একেবারে ক্লান্ত করে দিতে পারে যার গুরুতর প্রভাব দেখা যায় শরীরেও। কিন্তু আপনার চিন্তা করার বিষয়বস্তু নিয়ে চিন্তা শুরু করবার আগে এটা জেনে নিন যে গবেষণা আপনাকে দেখাচ্ছে কিভাবে সহজ কিছু মানসিক চর্চার মাধ্যমে দুশ্চিন্তা এবং নিষ্পেষণ কমিয়ে রাখতে হয়।

আপনাকে সর্বপ্রথম মনোযোগ দিতে হবে আপনার দৈনন্দিন জীবনে যা আপনি করেন এবং যা আপনি দূরে সরিয়ে রাখেন সেগুলোর উপর। এটির চর্চা করা মানে হচ্ছে মনকে দিয়ে শরীরকে একটু ঝালিয়ে নেওয়া। চিন্তার কিছু নেই! এরজন্য আপনাকে এক ঘন্টাও কাটাতে হবে না কিংবা বিশেষভাবে কঠিন অঙ্গভঙ্গী করে বসে থাকারও কোনো দরকার নেই।

আপনাকে শুধুমাত্র মনের দিক থেকে দৃঢ় হতে হবে।
তো দেখা যাক ট্রিকগুলো:

১) একটা উদ্দেশ্য তৈরি করুন

এটা জরুরি দেখেই দেখবেন যে আপনার ইয়োগা টিচার প্রতিদিনই আপনাকে একটি উদ্দেশ্য চর্চা করতে বলে। সকালে কোনো জার্নাল পড়া বা অন্য যেকোনো কাজ করার আগে একটি উদ্দেশ্য তৈরি করুন যে কেন আপনি এটি করছেন? ফলে আপনার কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে আপনার মনোযোগ যাবে এবং আপনি একটি অর্থ খুঁজে পাবেন।

যেমন কর্মক্ষেত্রে আপনার আজ বিশাল একটি বক্তব্য থাকলে যা আপনার চিন্তার উদ্রেক করছে তার জন্য একটি উদ্দেশ্য তৈরি করুন। যেমনটি আপনি জিমে গেলে করে থাকেন, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়া।

২) মেডিটেশন বা মনোযোগের চর্চা করুন

মেডিটেশন করুন নিয়মিত; Image source: bulletproof.blog

আজকাল মেডিটেশনও খুব সহজ হয়ে গেছে। একটি খোলা জায়গা আর ফোনে একটি এপ হলেই চলে। এপ এবং অনলাইন প্রোগ্রামের মাধ্যমেই আপনি মেডিটেশনের গভীর রাস্তায় পথ চলা শুরু করতে পারবেন ফলে বেশি সময় কিংবা ব্যয়বহুল কোনো ক্লাসের আর প্রয়োজন হচ্ছে না। মেডিটেশনকে কেন্দ্র করে অসংখ্য এপ পাবেন অনলাইনে। আপনার মেডিটেশন শুরু করবার জন্য এই এপগুলোই যথেষ্ট।

৩) হিজিবিজি আঁকুন বা রঙ করুন

মিনিট দুয়েক হিজিবিজি কিছু আঁকতে থাকুন। তাতে আপনি সৃজনশীল কিছুর যেমন একটা স্বাদ পেয়ে যাবেন তেমনি আপনির মনটাও অবকাশ পাবে খানিক। এই আঁকাআঁকি কি আপনার চিন্তা দূর করে? নির্লজ্জভাবে আপনি যা ইচ্ছে আঁকুন তাতে অন্তত আপনি কিছু পূর্ণতার স্বাদ পাবেন, খালি কোনো পৃষ্ঠার সম্মুখীন আপনাকে হতে হবে না।

৪) হাঁটতে বের হোন

শুধু দেহের জন্য নয় মানসিক প্রশান্তির জন্যও হাঁটুন; Image source: daily mail

চিন্তার সময়টায় হাঁটাহাঁটি দারুণভাবে ফলপ্রসু! চারপাশের শব্দ শুনুন, আকাশের বিপরীতের বাতাসকে অনুভব করুন, গন্ধ শুঁকে নিন প্রকৃতির। পকেট থেকে ফোন বের করবেন না কিংবা বাড়িতেই রেখে বের হবেন। যতটা সম্ভব আশেপাশের প্রকৃতির উপর মনোযোগ বসাতে চেষ্টা করুন। উদ্বেগের মুহূর্তে তাহলে হাঁটতে বেড়িয়ে যান আর নিজেই দেখুন কেমন অনুভব করছেন।

৫) অন্যের সুখানুভবে শুভেচ্ছা জানান

গুগলের সাহায্যে বা কোনো লেখকের কাছ থেকে এটি চর্চা করতে মাত্র ১০ সেকেন্ড লাগবে আপনার। সারাদিনে একবার হলেও শুভেচ্ছা জানান কাউকে। এই চর্চাটি আপনার মাথায় থাকবে। আর তাকে আপনার বলারও প্রয়োজন নেই মানসিক শক্তি সঞ্চয়ের জন্য আপনি এটি করছেন।

এটি আপনি বিনিময় করতে পারেন আপনার অফিসে, জিমে কিংবা যেখানে দাঁড়িয়ে আপনি অপেক্ষা করেন। বোনাস পয়েন্ট হবে আপনার যদি কাউকে বিরক্ত কিংবা বিষণ্ণ মনে হয় তাকে আপনি থামান এবং সুখানুভূতির কোনো শুভেচ্ছা জানান।

৬) গণনা করুন

গভীর করে নিঃশ্বাস নিন; Image source: upworthy

শুধু আপনার সামনে থাকা স্ক্রিনেই না আকাশের দিকে তাকিয়েও তারা গুনুন না? যখন আপনি খুব ঝক্কি ঝামেলা পোহাচ্ছেন কিংবা বাসায় দেরি করে ফিরছেন একটু থামুন, খুব জোরে কিছু নিঃশ্বাস নিয়ে পেটে কতবার বাতাস ঢুকাচ্ছেন তা ই গুনুন। আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে জানিয়ে দিন আপনার চিন্তাভাবনার ইনবক্সের চেয়েও এই জীবন আরো বড়।

৭) পাতা ফুটিয়ে পানীয় বানান

চা বানানোতে মনোনিবেশ করুন; Image source: The independent

পৃথিবী জুড়ে অনেক সংস্কৃতি এক কাপ চা বানানোকে খুব গভীরভাবে ধারণ করছে। আপনিও তা চর্চা করুন, মনোযোগ নিবেদন করুন। কেমন গন্ধ পান যখন চায়ের পাতা গরম পানিতে ডুবান? চুলার বুদবুদ উঠা গরম পানিকে দেখুন, কাপ নেওয়ার পর হাতে যে গরম লাগে তা অনুভব করুন।

যদি সময় থাকে, কোনো চিত্তবিক্ষেপ ছাড়া আস্তে আস্তে চায়ে চুমুক দিন। এই চর্চাটি আপনি প্রতিদিন করতে পারেন সুগন্ধযুক্ত ফ্রেঞ্চ-প্রেসড কফি বানানোর ক্ষেত্রেও।

৮) একটি সময়ে একটি জিনিসের উপরই মনোনিবেশ করুন

হ্যাঁ, আপনার প্রাত্যহিক কাজের লিস্ট আপনার মনোযোগের লিস্ট হয়ে উঠবে যদি আপনি এটি সঠিকভাবে করে থাকেন। পাঁচ মিনিটের একটি টাইমার নির্ধারণ করুন এবং অন্য কোনো কাজে মনোযোগ না দিয়ে পুরোদমে সে কাজটিই করতে থাকুন।

সে মুহূর্তে ফোন চেক করবেন না, কোনো নোটিফিকেশনও অন রাখবেন না, কোনো ব্রাউজিং নয়। মোদ্দাকথা আর অন্য কোনো কাজ নয়। যতক্ষণ না পর্যন্ত কাজটির মূলকেন্দ্রে পৌঁছতে পারছেন টাইমার বারবার সেট করুন।

৯) আপনার ফোন দূরে রাখুন

প্রয়োজন ব্যতীত ফোন থেকে দূরে থাকুন; Image source: dailyvoice

যখন আপনি এক রুম থেকে অন্য রুমে যাবেন তখনও ফোনটা নেওয়া খুব জরুরি কি? যখন বাথরুমে যান? যখন খেতে বসেন? ফোনটি আপনার অন্য রুমে রেখে আসুন। এটির কথা ভাবা বন্ধ করে বসুন, খাওয়া শুরুর আগে নিঃশ্বাস নিন। নিজের জন্য কিছু মুহূর্ত তৈরি করুন, বাথরুমে গেলেও। যখন আপনার কাজ শেষ হয়ে যাবে ফোন আবার হাতে পাবেনই।

১০) ঘরের কাজগুলোকে মানসিক বিরতিতে পরিণত করুন

ঘরের অভ্যন্তরে যে প্রাত্যহিক কাজগুলো আপনাকে করতে হয় সেগুলোকে বোঝা মনে না করে উপভোগের মাধ্যমে শেষ করতে চেষ্টা করুন। যেমন আপনি যখন প্লেট ধুচ্ছেন গান শুনতে শুনতে গুনগুন করে সেগুলো স্বাচ্ছন্দ্যে ধুয়ে ফেলতে পারেন। নাঁচের অঙ্গভঙ্গীতে ঘরের মেঝেতে সাবান লাগিয়ে তা ধুয়ে ফেলতে পারেন।

মাইক্রোওভেনের সামনে অপেক্ষা করার সময়টুকুতে ধীরেধীরে নিশ্বাস নিয়ে নিলেন পাঁচবার। দিবাস্বপ্ন দেখতে দেখতে লন্ড্রির ভাঁজ শেষ করে ফেলুন।

এই কাজগুলো প্রতিদিন চর্চা করুন। দৈনন্দিন জীবনের বেড়াজাল থেকে, দুঃশ্চিন্তা থেকে খানিক হলেও দূরে সরে থাকতে পারবেন।

Feature Image: ParkLives